চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র হালদা নদীতে গত এক সপ্তাহের মধ্যে মারা গিয়েছে তিনটি গাঙ্গেয় ডলফিন। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের লাল তালিকাভুক্ত (অতি বিপন্ন প্রজাতি) জলজ প্রাণী ডলফিন। বিশ্বের বিভিন্ন নদীতে বিপন্ন প্রজাতির ডলফিন আছে মাত্র ১ হাজার ১০০টি। এর মধ্যে শুধু হালদাতেই ছিল ১৭০টি। গত চার বছরে হালদায় ৩৮টি ডলফিন মারা যায়। আবার গত দুই বছর বর্ষা মৌসুমে হালদায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ডিমও ছাড়েনি মা মাছ। সব মিলে, হালদার জীববৈচিত্র্য এখন অনেকটাই অরক্ষিত।

২০২০ সালে হালদা নদীকে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, হালদা থেকে কেউ আর মাছ এবং জলজ প্রাণী শিকার করতে পারবে না বলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও তা মানা হচ্ছে না। হালদা বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার হালদার ব্যাপারে সহনশীল হলেও দুর্বৃত্তদের কারণে কারেন্ট জাল ব্যবহার এবং মা মাছ নিধন বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। হালদা নদীতে দুর্বৃত্তদের অপকর্ম ঢাকতে সিসিটিভি লাগানো হলেও কার্যত কোনো সুফল মিলছে না।

২০১৯ সালে হাইকোর্ট হালদা নদীর ডলফিন রক্ষায় একটি কমিটি গঠন করেন। সেখানে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সদস্য রাখা হয়। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলেও কারেন্ট জালের ব্যবহার কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে হালদা গবেষক ড. মো. শাফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, গত বছরও হালদা নদীতে মা মাছ ডিম ছাড়েনি। অথচ তার আগের বছরে মাছের ডিম কিংবা রেণু সংগ্রহে রেকর্ডের পর রেকর্ড হয়েছে। হঠাৎ গত দুই বছরে প্রশাসনের তত্পরতা বাড়ানো এবং স্থানীয়দের সচেতনতা বাড়ানো হলেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যায়নি। অবৈধভাবে জাল ও বিষ ব্যবহার করে মাছ ধরা, দূষণ, পলি জমাট ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হালদার বাস্তুতন্ত্র মাছ ও ডলফিনের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে। হালদার বাস্তুতন্ত্রকে স্বাভাবিক রাখতে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির তথ্যমতে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত হালদা নদী ও এর শাখা খালে মোট ৩৮টি ডলফিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মারা যাওয়া মৃত ডলফিনগুলোর মধ্যে বেশির ভাগেরই শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এমনকি কিছু ডলফিনের চর্বি কেটে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। তাছাড়া জালে জড়িয়ে যাওয়ায় অনেকগুলো ডলফিন পিটিয়ে মারা হয়েছে—এমন প্রমাণও পাওয়া গিয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান জানান, হালদা নদী রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনসহ পুলিশও কাজ করে যাচ্ছে। হালদা দূষণকারী প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে নদীসংলগ্ন ১৭টি শিল্প-কারখানা বন্ধ করাসহ ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। স্থানীয়দের আরো সচেতন করা গেলে হালদায় জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু কী কারণে হালদায় ডলফিনের মৃত্যু হচ্ছে সেটি আমরা শনাক্তের চেষ্টা করছি।

হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি এবং চবির প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া ডলফিনশুমারি করেন। তাদের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৮ সালে ১৬৭টি, ২০২০ সালে ১২৭টি এবং চলতি বছরে ১৪৭টি ডলফিনের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। ডলফিনের প্রজননের হার তুলনামূলক কম।

চবির হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মনজুরুল কিবরিয়া বণিক বার্তাকে জানান, ডলফিন যেভাবে মারা যাচ্ছে তা খুবই উদ্বেগজনক। কারেন্ট জাল ব্যবহার বেড়ে যাওয়া ও স্থানীদের হালদার ব্যাপারে উদাসীনতার কারণে মা মাছ মারা যাওয়া, ডলফিনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। পদক্ষেপ না নিলে হালদা ডলফিনশূন্য হবে।