নড়াইলের চাষীরা বংশানুক্রমে পাটের আবাদ করলেও পাটকাঠির বহুল ব্যবহার ও মূল্য সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। বাজারে শুধু পাট বিক্রি করতেন। আর পাটকাঠি জ্বালানি ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করতেন। কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন কারখানার কাঁচামাল হিসেবে পাটকাঠির ব্যবহার বেড়েছে। পার্টিকেল বোর্ড ও চারকোল কারখানায় কৃষিপণ্যটির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। রাজধানী ঢাকা, বরিশাল, কুমিল্লা ও ভোলাসহ বিভিন্ন পারটেক্স বোর্ড কারখানায় পাটকাঠি সরবরাহ করা হচ্ছে। আকিজ গ্রুপের মতো বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও পাটকাঠি ব্যবহৃত হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাট মূলত বর্ষা মৌসুমে আবাদ হলেও পাটকাঠির চাহিদা থাকে বছরজুড়ে। বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে পণ্যটি বেশি বিক্রি হয়। নড়াইলে বছরে প্রায় শতকোটি টাকার পাটকাঠি বেচাকেনা হয়। এছাড়া চীন, মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, তাইওয়ানসহ কয়েকটি দেশে পাটকাঠির ছাইয়ের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। তারা পাটকাঠি থেকে কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপি মেশিনের কালি, আতশবাজি, ফেসওয়াশের উপকরণ, প্রসাধনী পণ্য তৈরি করছে। নড়াইলের অর্থকরী পণ্য হয়ে উঠেছে এক সময়ের ফেলনা পাটকাঠি।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আকারে বড় পাটকাঠি কাউন হিসেবে এবং ছোটগুলো কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে ছোট পাটকাঠি প্রতি মণ ৪০০-৫০০ টাকায় কিনছেন ব্যাপারীরা। এছাড়া ভালোমানের ১০০টি পাটকাঠি ৬০০-৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
লোহাগড়া উপজেলার গাছবাড়িয়া গ্রামের কৃষক তাপস বিশ্বাস। পরের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেন। গত মৌসুমে তিনি প্রায় তিন একর জমিতে পাট আবাদ করেছিলেন। কয়েক বছর আগেও পাটকাঠির তেমন দাম ছিল না। তখন তিনি পাটকাঠি গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করতেন। এ বছর ২০ হাজার টাকার পাটকাঠি বিক্রি করেছেন।
খুলনা থেকে ট্রলারে করে নড়াইলে পাটকাঠি নিতে এসেছেন আজমল মিয়া। তিনি জানান, আট বছর ধরে তিনি নড়াইল থেকে পাটকাঠি নিয়ে খুলনার বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেন। নদী পথে তিনি প্রতি সপ্তাহে একটি করে ট্রিপ দেন। মাসে তিনি চার-পাঁচটি ট্রিপ দেন পাটকাঠি নিয়ে।
যশোরের অভয়নগর উপজেলার ব্যবসায়ী তারা মিয়া বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের কাছ থেকে পাটকাঠি কেনার জন্য আমার সঙ্গে ১৫ জন ব্যবসায়ী রয়েছেন। তারা কৃষকদের কাছ থেকে পাটকাঠি কিনে বড়গুলো বাছাই করেন। পরে তা পানবরজের মালিকদের কাছে বিক্রি করেন। যে এলাকায় পানের আবাদ বেশি হয়, বড় সাইজের পাটকাঠি সেই এলাকায় বিক্রি করেন। ছোট সাইজের পাটকাঠি ঢাকা ও চট্টগ্রামে কয়েকটি কারখানায় বিক্রয় করা হয়। গত বছরের তুলনায় এ বছর পাটকাঠির দাম একটু বেশি।’
১১ বছর ধরে নড়াইল থেকে পাটকাঠি কিনে বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করেন বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার ইকবাল শেখ। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর নড়াইল থেকে পাটকাঠি নিয়ে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করছি। নদীপথে পাটকাঠি পরিবহন করতে খরচ অনেক কম। তবে যেসব জেলায় নদী পথে পরিবহন করা যায় না, সেখানে ট্রাকে করে সরবরাহ করা হয়।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত মৌসুমে নড়াইলে ২৩ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল। এ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার ৯৮৫ টন পাটকাঠি উৎপাদন হয়েছে। যার বাজার দাম অন্তত ১৩৫ কোটি টাকা। জেলায় যে পাটকাঠি উৎপাদন হয় তার প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ বিক্রি করা হয় ব্যবসায়ীদের কাছে।
এ ব্যাপারে নড়াইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. জসিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে পাটকাঠি বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে পাটকাঠির চাহিদা বেড়ে গেছে। পাটকাঠি বিক্রি করে কৃষক লাভবান হওয়ায় পাট চাষও বাড়ছে। আগামী মৌসুমে জেলায় পাটের আবাদ আরো বাড়বে।’










