শুষ্ক মৌসুমে কমতে শুরু করেছে বগুড়ার করতোয়া নদীর পানি। এই সুযোগে নদীর পাড় দখল করে নির্মাণ শুরু হয়েছে স্থাপনা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালানো হলেও থেমে নেই দখল। সমানতালে চলছে নদী দূষণও। শহরের ময়লা ও কারখানার বর্জ্য ফেলায় পানি দূষিত হচ্ছে। এ কারণে নদীতে এখন আর আগের মতো মাছও পাওয়া যায় না বলে দাবি করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বগুড়া জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বগুড়া শহরের মধ্যে করতোয়া নদীর বেশ কয়েকটি স্থান দখল হয়েছে। দুই পাড়ে অবৈধ ভবন, বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। অনেকে সেগুলো ভাড়াও দিয়েছে। অনেকবার নদী দখলের সঙ্গে জড়িতদের নামের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু দখলদারের কাছ থেকে নদীর পাড় উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিগুলো মামলা রয়েছে। নতুন করে দখলদারদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। নতুন দখলদারের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এ বিষয়ে বগুড়া জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘করতোয়া নদী বগুড়ার প্রাণ। কিন্তু দখল-দূষণে নদীর প্রাণবৈচিত্র্য প্রায় নিঃশেষ। শহরের অংশে প্রায় সাড়ে ১৩ কিলোমিটার নদী প্রবাহিত হয়েছে। নদীকেন্দ্রিক শহর ছিল একসময় বগুড়া। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করতোয়া নদীর দুই পাড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অনেকবার অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হবে।’
জানা যায়, বগুড়া শহরের বুক চিরে প্রবাহিত করতোয়া নদীর সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বগুড়া অংশে। দুই পাড়ের বিভিন্ন স্থানে দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, ড্রেনের আবর্জনা ফেলায় তলদেশ ভরাট হয়ে মরে যাচ্ছে নদীটি। দিনের পর দিন সরু হয়ে এক সময়ের খরস্রোতা নদীতে পানিপ্রবাহ নেই বললেই চলে। কিছু প্রভাবশালী নদীর পাড় দখল করে গড়ে তুলছেন বহুতল ভবন। নির্মাণ করছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ টিনশেড বাড়ি। কোথাও কোথাও আবার নদীর মধ্যেই সীমানাপ্রাচীর দিয়ে দখল করে ভবন তৈরি করা হয়েছে।
বগুড়া শহরের মালতিনগরের বাসিন্দা সাদেকুর রহমান জানান, করতোয়া নদী দখল হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রশাসন থেকে অনেকবার উচ্ছেদ অভিযান চালালেও পরে আবারো অনেকেই সেই স্থানে অস্থায়ীভাবে ঘর তুলেছে। অনেকে ঘর নির্মাণ করে ব্যবসার জন্য ভাড়াও দিয়েছে। নদীর তলায় এখন ড্রেনের কালো পানি। নদী থেকে প্রতিদিন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মশা, মাছির উৎপত্তিসহ নানা রোগজীবাণু ছড়াচ্ছে।
করতোয়া নদী বগুড়া শহরের বুক চিরে প্রবাহিত হয়ে শেরপুর উপজেলার চান্দাইকোনায় বাঙালি নদীতে গিয়ে মিলেছে। এর মধ্যে অধিকাংশ স্থানে দূষণ, দখল, ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদী সরু হয়ে গেছে। সাম্প্রতি নদীতে পানি কমতে থাকায় শহরের মাটিডালি লোহার ব্রিজ এলাকায় পাড় দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। শহর এলাকার মধ্যে চেলোপাড়া, উত্তর চেলোপাড়া, মালতীনগর, ফুলবাড়ী, মাটিডালি, রাজাবাজার, ফতেহ আলী সেতু, মহাস্থানগড় এলাকায় দখলের হার সবেচেয়ে বেশি।
এ বিষয়ে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাজমুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘করতোয়া নদী রক্ষায় বেশকিছু কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। একটি প্রকল্পের আওতায় নদী দূষণ বন্ধ, শহরের যানজট নিরসনে সড়ক নির্মাণ করা হবে। নদীর দুই পাড়ের ২৭ কিলোমিটার এলাকায় ২০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা ও ছয় ফুট ওয়াকওয়ে নির্মাণ, মাস্টার ড্রেন নির্মাণকাজ, পানি নিয়ন্ত্রণে তিনটি অবকাঠামো নির্মাণ, নদীর দুই পাড়ে সৌন্দর্যবর্ধন, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের অধীনে ভূমি অধিগ্রহণ থাকবে। প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। টাকার পরিমাণ আরো বাড়তে পারে। কারণ নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ার কারণে নির্মাণ ব্যয়ও বেড়ে যায়।’










