দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ২০১৯ সাল থেকে দেশে প্রতি বছর গড়ে ১০ লাখ টন করে এলএনজি সরবরাহ করছে মাসকাটভিত্তিক ওমান ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল (ওটিআই)। এর পরের বছর ২০২০ সালে এ সরবরাহ আরো ১০ লাখ টন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল কোম্পানিটি। ওই সময়ে প্রস্তাবিত দর ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ৭ থেকে ১০ ডলার করে। বিষয়টি নিয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি পেট্রোবাংলা। আন্তর্জাতিক বাজারে তখন এলএনজির স্পটমূল্য ছিল কম। দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ নিশ্চিতের পরিবর্তে স্পট থেকেই তাত্ক্ষণিক মূল্যে এলএনজি সংগ্রহের পথ বেছে নিয়েছিল সংস্থাটি।
স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ক্রয়ের একটি প্রস্তাব গতকালই সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন পেয়েছে। এ অনুমোদন অনুযায়ী সিঙ্গাপুরের ভিটল এশিয়া থেকে ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ এলএনজি কেনা হবে। এক্ষেত্রে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির মূল্য পড়বে ২৯ ডলার ৭০ সেন্ট করে। এর আগে গত বছরের অক্টোবরে আরো বেশি দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করেছিল বাংলাদেশ। ওই সময়ে ভিটল থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ৩৫ ডলার ৮৯ সেন্ট ও গানভর থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ৩৬ ডলার ৯৫ সেন্ট মূল্যে এলএনজি আমদানি করেছিল পেট্রোবাংলা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওটিআইয়ের প্রস্তাব যথাসময়ে গ্রহণ করা হলে এলএনজি সংগ্রহে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে যেত। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতায় পণ্যটি নিয়ে এতটা ভুগতে হতো না জ্বালানি বিভাগকে। গ্যাসের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণের পাশাপাশি সাশ্রয় হতো পেট্রোবাংলার বিপুল পরিমাণ অর্থ। সময়মতো দূরদর্শী সিদ্ধান্ত না নিতে পেরে এ সুযোগ এখন অনেকটাই হারিয়েছে পেট্রোবাংলা।
কভিডের প্রাথমিক অভিঘাত মোকাবেলার পর গত বছরের শুরু থেকেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে জ্বালানি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার। এলএনজির দাম বাড়তে থাকে দ্রুতগতিতে। কয়েক গুণ বেড়ে আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে পণ্যটির মূল্য। বিশেষ করে স্পট মার্কেটে পণ্যটির দাম বেড়ে দাঁড়ায় অস্বাভাবিক পর্যায়ে। বাধ্য হয়েই স্পট থেকে এলএনজি আমদানি কমায় পেট্রোবাংলা। এর প্রভাব পড়ে এলএনজি আমদানিনির্ভর দেশের গ্যাস খাতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প ও গৃহস্থালি পর্যায়ে গ্যাসের সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। বছরের শেষ দিকে এসে ওটিআই এবং কাতারের এলএনজি সরবরাহকারী কোম্পানি কাতারগ্যাস জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহের পরিমাণ কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির শর্তে উল্লিখিত সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হবে। এর মধ্যে আবার চলতি বছরের শুরুর দিকে বৈশ্বিক এলএনজির বাজারে অশনিসংকেত নিয়ে এসেছে ইউক্রেন সংকট। বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাস খাতের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি দুশ্চিন্তায় ফেলেছে পেট্রোবাংলাকে। স্পট থেকে এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে সংস্থাটির আর্থিক চাপ আরো মারাত্মক হয়ে দেখা দিচ্ছে।
দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে সরবরাহ করা হচ্ছে ২৮০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি। এর মধ্যে এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে ৫৫ কোটি ঘনফুট। দেশে দৈনিক সরবরাহকৃত গ্যাসের ২০ শতাংশই এলএনজি। আমদানীকৃত এলএনজির একটি অংশ আসছে স্পট মার্কেট থেকে। সেখান থেকে পণ্যটি সংগ্রহে বিপুল অংকের অর্থ গুনতে হবে জ্বালানি বিভাগকে। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে পেট্রোবাংলাকে এলএনজি আমদানি করতে হবে মোট ৩২ হাজার কোটি টাকার। বিষয়টি সামগ্রিকভাবে দেশে সরবরাহকৃত গ্যাসের মূল্যে প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
এ বিষয়ে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ওমান যে সময় এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, তখন স্পট মার্কেটে জ্বালানি পণ্যটির মূল্য কম ছিল। প্রতি এমএমবিটিইউ ৫-৬ ডলার ছিল। আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে হলে একটি নির্দিষ্ট মার্জিন থাকে। সে সময় চুক্তি করতে হলে ৭-১০ ডলারের মধ্যে করতে হতো। ফলে সাশ্রয়ী বিবেচনার কথা ভেবে চুক্তির বিষয়ে এগোনো হয়নি। কভিড মহামারীসহ নানা কারণে বাজার যে অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে, সে সময় তা-ও বোঝা যায়নি।
সিপিডির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, চলতি অর্থবছরে প্রতি ইউনিট এলএনজিতে নির্ধারিত মূল্য দেশে ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ২৪ গুণ বেশি। আমদানি ও বিক্রয়মূল্যের এ ব্যবধান পেট্রোবাংলার লোকসানের বোঝা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। জ্বালানি বাজারের বর্তমান অস্থিতিশীলতা এ বোঝাকে আরো বাড়িয়ে চলেছে। এক্ষেত্রে বড় প্রভাবক হয়ে উঠেছে স্পট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি।
গত বছরের ডিসেম্বরে ওটিআই জানিয়েছে, চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি সরবরাহ কমাতে যাচ্ছে আগের বছরের তুলনায় অন্তত সাড়ে ১৫ শতাংশ। এলএনজি সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত পেট্রোবাংলার কোম্পানি রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে ওমান থেকে ২৪ কার্গো এলএনজি এসেছে। চলতি বছরের এডিপিতে দেশটি থেকে ১৬ কার্গো এলএনজি আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের চেয়ে চলতি বছরে অন্তত আট কার্গো এলএনজি কম আসছে। কার্গো কম আসায় এরই মধ্যে স্পট থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পেট্রোবাংলা। চলতি অর্থবছরে স্পট থেকে ১৩ কার্গো এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, আগে যেসব প্রস্তাব দিয়েছে সেগুলো হয়তো সময় অনুযায়ী করা যায়নি। তবে এখন যারা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির প্রস্তাব দেবে, সেটি আমাদের শর্তের মধ্যে ইতিবাচক হলে সরকার তা বিবেচনা করবে। স্পট মার্কেটে এখন যে অবস্থা, সে পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এখন আমাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে জোর দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। অনেকগুলো দেশের সঙ্গে এলএনজি আমদানির জন্য আমাদের সমঝোতা চুক্তি রয়েছে। আমরা এখন সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখছি।
দূরদর্শিতার অভাবই দেশের জ্বালানি খাতকে আজকের এ অবস্থায় নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমদানি পণ্য নিয়ে পরিকল্পনা করতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারের কাঠামো ও পরিবর্তনশীলতা বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের ঘাটতি বিবেচনায় পুরোটাই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল। তবে কারিগরি সক্ষমতা বিবেচনায় আমরা কতটুকু গ্রহণ করতে পারব সেটিরও একটা ব্যাপার রয়েছে। আমরা ৭২ লাখ টন রিগ্যাসিফিকেশন করতে পারি। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আমরা ৪০ লাখ টন কিনছি। বাকি ৩২ লাখ টন স্বল্পকালীন চুক্তিতে কেনার পরিকল্পনা করেছিলাম। কিন্তু ঘাটতি বিবেচনায় আমাদের ৬০ লাখ টন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যাওয়া উচিত ছিল। যেহেতু আমাদের ঘাটতি, তাই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আমাদের বেশি পরিমাণ কেনার দরকার ছিল। ঘাটতি না থাকলে স্পট মার্কেটের সুবিধা বিকল্প হিসেবে রাখা যেত।
কাতারের সঙ্গে এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হয় ২০১৭ সালে। এর পরের বছর ওমান থেকে এলএনজি আমদানি চুক্তি হয়। ১০ বছর মেয়াদি এ চুক্তির আওতায় দেশে প্রথম কার্গো আসে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি। ওই বছর ওমান থেকে ২০টি কার্গো আসে। এরপর ২০২০ সালে ২৬টি ও ২০২১ সালে ২৪ কার্গো আমদানি করা হয়।










