নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁর কাঁচপুর। কভিড সংক্রমণ প্রতিরোধে চলমান বিধিনিষেধের মধ্যেই ওই এলাকায় ৮ জুলাই দেখা দিয়েছিল শ্রমিক অসন্তোষ। তিন মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে পথে নেমেছিলেন ওপেক্স অ্যান্ড সিনহা গ্রুপের শ্রমিকরা। তাদের বিক্ষোভের কারণে সড়কে সৃষ্টি হয় যানজট। দুই পাশে আটকা পড়ে পণ্যবাহী ট্রাক, প্রাইভেট কারসহ অসংখ্য যানবাহন। পরে বকেয়া পরিশোধের আশ্বাসে পথ ছাড়েন শ্রমিকরা। আজ তাদের সেই বকেয়া পরিশোধের কথা রয়েছে।

শ্রমিকরা বণিক বার্তাকে জানান, এর আগেও বকেয়া বেতনের দাবিতে আন্দোলন করতে হয়েছে তাদের। পরে পুলিশ প্রশাসন মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বেতন পরিশোধের আশ্বাস দেয়। তবে এর পরও সমাধান হয়নি। এখন তিন মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। বেতন না পাওয়ায় বাড়ি ভাড়া দিতে পারছেন না শ্রমিকরা। সংসার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। অনেক শ্রমিকের পরিবার না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। তাই বেতনের দাবিতে আবারো পথে নামতে হয়েছে। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে।

একই দিন অসন্তোষের ঘটনা ঘটে শিল্প অধ্যুষিত আরেক এলাকা গাজীপুরে। লক্ষ্মীপুরায় স্থাপিত স্টাইল ক্রাফট লিমিটেডের শ্রমিক-কর্মচারীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। তাদেরও বাকি রয়েছে তিন মাসের বেতন। ১৫ জুলাই বেতন পরিশোধের কথা থাকলেও মালিকপক্ষের আগের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিজ্ঞতা থেকেই বিধিনিষেধের মধ্যেও বাধ্য হয়ে পথে নেমেছিলেন বলে জানালেন শ্রমিকরা।

ঈদের আগে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা এবার নতুন নয়। প্রতি বছরই দুই ঈদের আগে দেশের শিল্পঘন এলাকাগুলোতে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। এবারো পরিস্থিতি কঠোর নজরদারিতে রেখেছে শ্রমঘন এলাকাগুলোর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি তদারকির দায়িত্বে থাকা শিল্প পুলিশ। বাহিনীটির তথ্যমতে, আসন্ন ঈদুল আজহার আগে বেতন-ভাতা ও বোনাস দিতে অসমর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ৫৩০টি শিল্প কারখানার। এর মধ্যে অনেক কারখানা মে মাসের বেতনও দিতে পারেনি। এরপর যোগ হয়েছে জুন, জুলাইয়ের ২১ দিনের বেতন ও ঈদ বোনাস।

শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, মে-জুনের ধকলই অনেক কারখানা সামাল দিয়ে উঠতে পারেনি। এ প্রেক্ষাপটে চলতি মাসের শুরুতে আশঙ্কাজনক ৬৫০ কারখানার তালিকা হয়েছিল। ১১ জুলাই পর্যন্ত এ সংখ্যা কমে ৫৩০-এ এসে দাঁড়িয়েছে। এ কারখানাগুলোর মধ্যে গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মূল শঙ্কা সাব-কন্ট্রাক্ট পদ্ধতিতে কাজ করে এমন কিছু কারখানা নিয়ে। তবে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় বড় ধরনের গোলযোগ ছাড়াই শ্রমিকরা ঈদ পালন করতে পারবেন বলে এখনো প্রত্যাশা করছেন শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারা।

শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, সমস্যাসংকুল কারখানাগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। গুরুতর, মধ্যম ও সাধারণ—তিন মানে ভাগ করে যে তালিকাটি করা হয়, তা ধারাবাহিকভাবে পরির্বতন হয়। সমস্যাসংকুল কারখানাগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। এ প্রক্রিয়া চলবে ঈদের আগ পর্যন্ত। তার পরও যেগুলোর খুব বেশি খারাপ অবস্থা সেগুলোর বিষয়ে আলাদাভাবে সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে উদ্যোগ নেয়া হবে।

এ বিষয়ে শিল্প পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল আইজিপি) মো. শফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বেতন-বোনাস শ্রমিকরা পেয়ে যান। আজ পর্যন্ত গত জুনের বেতন দিয়েছে শিল্প পুলিশের আওতায় থাকা অনেক কারখানা। অবশ্য মে মাসের বেতন বকেয়া আছে এমন কারখানা এখনো আছে। গুটিকয়েক বড় ও সাব-কন্ট্রাক্ট করে এমন কারখানা নিয়ে সমস্যা হতে পারে। দু-চারটি কারখানা নিয়ে ঝামেলা আছে। সেগুলোয় বিরূপ পরিস্থিতি এড়াতে কাজ করছি আমরা। আশা করছি শেষ পর্যন্ত বড় কোনো সমস্যা হবে না।

আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও খুলনা—ছয়টি এলাকা শ্রমঘন বলে বিবেচিত। এসব এলাকায় বস্ত্র, তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, আসবাব, সেলফোন সংযোজন, ওষুধ ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে মোট কারখানা আছে ৭ হাজার ৯৮২টি।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আশুলিয়া-সাভার এলাকায় সব খাত মিলিয়ে মোট কারখানা আছে ১ হাজার ৩২১টি। এর মধ্যে ঈদুল ফিতরের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধে অসমর্থ হতে পারে এমন কারখানার সংখ্যা মোট ১১৯। এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ৬২, বিকেএমইএর ১৮ ও পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বস্ত্র শিল্প মালিক সংগঠন বিটিএমএ সদস্য সংখ্যা তিন। বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) আওতায় থাকা কারখানার সংখ্যা তিন। এছাড়া বেতন-ভাতা পরিশোধ অসমর্থ হতে পারে অন্যান্য খাতে এমন কারখানা আছে ৩৩টি।

গাজীপুর এলাকায় মোট কারখানা আছে ১ হাজার ৯৭২টি। এর মধ্যে ২৪৩টি কারখানা ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ করতে পারবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অসমর্থ হতে পারে এমন কারখানাগুলোর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ১৫০টি, বিকেএমইএর ১৮টি ও বিটিএমএর ১৭টি। এ এলাকায় নেই বেপজার আওতায় থাকা কোনো কারখানা। তবে অন্যান্য খাতের ৫৮টি কারখানাও রয়েছে বেতন-ভাতা পরিশোধ অসমর্থ হওয়ার তালিকায়।

বন্দর নগরী চট্টগ্রামে মোট কারখানা ১ হাজার ২৫০টি। সেখানে ৯২টি কারখানা বোনাস ও বেতন দিতে পারবে না বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে শিল্প পুলিশ। এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য কারখানা ৪২টি, বিকেএমইএর পাঁচটি ও বিটিএমএর সদস্য কারখানা রয়েছে চারটি। বেপজার আওতায় থাকা এমন কারখানার সংখ্যা ১৬। বেতন-ভাতা পরিশোধে অসমর্থ হতে পারে অন্যান্য খাতে এমন কারখানা আছে ২৫টি।

নারায়ণগঞ্জে মোট কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ৫৮৪। বেতন-বোনাসের সমস্যায় পড়তে পারে ৫৩টি কারখানা। এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য কারখানার সংখ্যা ১৩, বিকেএমইএর ২২ ও বিটিএমএর চারটি। এ এলাকায় বেপজার আওতাভুক্ত কোনো কারখানা নেই। তবে অন্যান্য খাতের ১৪টি কারখানা আছে যারা বেতন-বোনাস পরিশোধে অসমর্থ হতে পারে।

ময়মনসিংহ শিল্প এলাকায় মোট ১৩১টি কারখানার মধ্যে ঈদুল ফিতরের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধে অসমর্থ হতে পারে ১৬টি। এখানে বিজিএমইএর সদস্য কারখানা সংখ্যা নয় ও বিটিএমএর সদস্য সংখ্যা পাঁচ। তবে বিকেএমইএর কোনো কারখানার বেতন-ভাতা দিতে সমস্যা হওয়ার শঙ্কা নেই। এছাড়া অন্যান্য খাতের দুটি কারখানায় বেতন-বোনাস নিয়ে সমস্যা হতে পারে।

খুলনায় মোট কারখানার সংখ্যা ৭২৪। এর মধ্যে অন্যান্য খাতের সাতটি কারখানা বেতন-ভাতা পরিশোধে অসমর্থ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

শিল্প পুলিশ ছাড়া দেশে প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থাটি হলো শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। এ সংস্থার কাছে শ্রম অসন্তোষের ঝুঁকিতে থাকা কারখানাগুলোর একটি তালিকা দেয়া হয়েছে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে। সেই তালিকা অনুযায়ী, শ্রম অসন্তোষের ঝুঁকিতে থাকা কারখানা সংখ্যা ৩৫৫। এরমধ্যে ৪৫টি ঢাকার, গাজীপুরের ১৫৫, সাভারের ৯০, চট্টগ্রামের ৩২, নারায়নগঞ্জের ২৫ ও ময়মনসিংহের আটটি। এর বেশির ভাগই পোশাক শিল্পের কারখানা।

জানতে চাইলে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহ সভাপতি এসএম মান্নান কচি বণিক বার্তাকে বলেন, শিল্প পুলিশের চিহ্নিত করা ৩০০টিসহ বিজিএমইএর ১০টি দল মোট ৫০০ কারখানাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে।