দুই দশক ধরে দেশে ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ নিম্নমুখী ছিল। তবে গত বছর থেকে মশাবাহিত সংক্রামক এ রোগের সংক্রমণ আবারো বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় রোগটি নির্মূল করা যায়নি। চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগের অন্তত ১৩ জেলার ৭২টি উপজেলায় ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। মূলত সারা দেশে মোট ম্যালেরিয়া রোগীর দুই-তৃতীয়াংশই পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার। গভীর জঙ্গলে প্লাজমোডিয়াম বর্গের এককোষীয় পরজীবীর বাহক অ্যানোফিলিস মশার আবাসস্থল হওয়ায় পার্বত্য অঞ্চলে এ রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০০৮ সালে ম্যালেরিয়া কমতে শুরু করে। ২০১৩ সালে কমে পৌনে ২৭ হাজার রোগী হলেও ২০১৪ সালে তা বেড়ে গিয়ে সাড়ে ৫৭ হাজারে দাঁড়ায়। এরপর প্রতি বছরই ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে রোগীর সংখ্যা। তবে ২০২১ সালে পাঁচ হাজার রোগী শনাক্ত হলেও ২০২২ সালে ১৮ হাজার রোগী পাওয়া গেছে। বছরের ব্যবধানে মৃত্যুও বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়ায়। ২০০৭ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ৫ লাখ ৮৭ হাজারের বেশি রোগী। এর মধ্যে মারা গেছে ৬৫৭ জন। দেশে বর্তমানে ১৩ জেলার ৭২ উপজেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব রয়েছে। তবে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় ম্যালেরিয়ায় আক্রান্তের হার সর্বোচ্চ। যদিও সারা দেশে ম্যালেরিয়া রোগীর ৭০ শতাংশের বেশি বান্দরবান জেলার দুর্গম এলাকার বাসিন্দা।
২০১৩ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ৪১ হাজার ৮৬৫ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে বান্দরবান জেলায় ১ লাখ ২৩ হাজার, রাঙ্গামাটিতে ৭২ হাজার, খাগড়াছড়িতে প্রায় ২৩ হাজার মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। বাকি রোগীরা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও কুড়িগ্রামের বাসিন্দা।
তবে বান্দরবানে রোগীর সংখ্যা বেশি হলেও চট্টগ্রাম জেলায় ম্যালেরিয়া রোগে মৃত্যু সর্বোচ্চ। ২০১৩-২২ সাল পর্যন্ত সারা দেশে ১৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ২ হাজার ৯৪৮ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। মৃত্যু হয়েছে ৭২ জনের। এরপর বান্দরবানে ৩০ জন, খাগড়াছড়িতে ১৯ জন, কক্সবাজারে নয়জন ও রাঙ্গামাটি, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহে দুজন করে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। আর একজন করে দুজনের মৃত্যু হয়েছে সিলেট ও সুনামগঞ্জে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটাপন্ন ম্যালেরিয়া রোগী চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা নেয়ায় জেলাটিতে মৃত্যু বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বান্দরবান সিভিল সার্জন ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেসব এলাকায় রোগী পাওয়া যায় সেসব এলাকা দুর্গম। চলতি বছরে জেলায় দুজন ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে এ রোগে। যারা গভীর জঙ্গলে কাজ করে তারাই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে জুমচাষী, কাঠুরে শ্রেণী-পেশার মানুষ ম্যালেরিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়। তারা পাহাড়ে মাচার ওপরে ঘরে মশারি ছাড়া রাত্রি যাপন করে। কীটনাশকযুক্ত এক ধরনের বিশেষ মশারি দেয়া হয়েছে ম্যালেরিয়াপ্রবণ অঞ্চলের বাসিন্দাদের। তবে তারা মশারি খাটিয়ে ঘুমাতে চায় না।’
বান্দরবানসহ খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কর্মকর্তারা বণিক বার্তাকে জানান, ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগী প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসার জন্য এলে তাদের জীবনের ঝুঁকি থাকে কম। যাদের অবস্থা সংকটাপন্ন হয় কেবল তাদেরকেই চট্টগ্রামের উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। হাই ফ্লো অক্সিজেন ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) প্রয়োজন হলে তখন চট্টগ্রাম পাঠানোর বিকল্প থাকে না। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পরও রোগীরা সচেতনতার অভাবে চিকিৎসা কেন্দ্রে আসেন না। অথচ এ তিন জেলায় কয়েকশ কমিউনিটি ক্লিনিকেও ম্যালেরিয়া নির্ণয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাবেক ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট খলিলুর রহমান জানান, ২০০৭ সাল থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলের জন্য সরকারের কর্মসূচিতে বৈশ্বিক অর্থায়ন ছিল। সে সময় কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। যেসব এলাকায় ম্যালেরিয়া বেশি সেসব এলাকায় শুরুতেই রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা প্রদানের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হয়। প্রতি বছর কীটনাশক বা বিষযুক্ত ওই মশারি দেয়া হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। মশা না থাকলে ম্যালেরিয়া হবে না। কর্মসূচির মূল বিষয়বস্তু ছিল প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী শনাক্ত এবং দ্রুত চিকিৎসার আওতায় নেয়া। ম্যালেরিয়ার সঙ্গে বৃষ্টিপাতেরও সম্পর্ক রয়েছে। অ্যানোফিলিস মশা এ রোগের প্রধান বাহক। এ মশা গভীর জঙ্গলে অবস্থান করে। ফলে মশারি টাঙিয়ে ঘুমালে ম্যালেরিয়া থেকে বেঁচে থাকা যায়। তবে দুর্গম পার্বত্য এলাকায় মশারি খাটিয়ে ঘুমানোর প্রবণতা কম।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘দেশে ম্যালেরিয়া আগের চেয়ে ৭৯ শতাংশ কমেছে। মৃত্যুও কমেছে ৯১ শতাংশ। ম্যালেরিয়া নির্মূলের জন্য কর্মসূচি চলমান রয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে আক্রান্ত শূন্যে নামিয়ে আনা ও ২০৩০ সালে ম্যালেরিয়া নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’










