তিস্তার ভাঙনে সাতবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিলেন লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের চর রুদ্রেশ্বরের বাসিন্দা কামরুজ্জামান। তিস্তার ভাঙাগড়া খেলার সঙ্গেই চড়াই-উতরাই ছিল তার জীবনে। পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কেটেছে অগণিত। যে তিস্তা সব কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব করেছিল কামরুজ্জামানকে, সেই তিস্তাই আবার তার জন্য আশীর্বাদ হয়ে ফিরে এসেছে। দুই দশক ধরে তিস্তা চরে গম, ভুট্টা, ধানসহ বিভিন্ন শাক-সবজি চাষ করে পাল্টে গেছে তার জীবন। এখন তিন ছেলে-মেয়েকে পড়াশোনা করানোর পাশাপাশি নির্মাণ করেছেন পাকা ঘরও। শুধু কামরুজ্জামানই নন, তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান ও রত্নাই নদীর অববাহিকার ৭২ চরের প্রায় সাড়ে ৩১ হাজার কৃষকই এখন সচ্ছল। কঠোর পরিশ্রম ও বছরব্যাপী চাষাবাদই পাল্টে দিয়েছে লালমনিরহাটের চরবাসীর চিরাচরিত সেই অভাব-অনটনের চিত্র।

লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি উপজেলায় ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৩০টি কৃষি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে জেলার ৭২টি চরে বসবাসরত কৃষি পরিবারের সংখ্যা ৩১ হাজার ৬৩৭টি পরিবার। মোট ১ লাখ ৩৮৪ হেক্টর কৃষি জমির মধ্যে চরের কৃষি জমির পরিমাণ ৮ হাজার ২৯৪ হেক্টর। এসব চরে চিনাবাদাম, আমন-বোরো ধান, ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজির পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়া, সরিষা, মাষকলাই, আলু, মিষ্টি আলু, মরিচ, তরমুজ, গম ও কলা আবাদ করা হয়।

যদিও এখনো চরের ২ হাজার ৫০৬ হেক্টর জমি পতিত রয়েছে বলে সরকারি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

লালমনিরহাটের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা খবির উদ্দিন বলেন, বাস্তবে চরের পরিমাণ আরো বেশি হবে। এখনো অনেক চর সরকারি হিসাবে যুক্ত হয়নি। লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামীম আশরাফ বলেন, চরের নাম তালিকাভুক্ত করতে কাজ চলছে। সঠিক পরিসংখ্যানের জন্য কৃষি বিভাগ ডাটাবেজ তৈরির কাজ করছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সদর উপজেলার তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠা চর তিস্তার ২২৫ হেক্টর, চর মধুরাম, খলাইঘাট, চাংড়া, চিনাতুলিতে ১৩১০ হেক্টর, চর হরিণ চওড়া, বাঁশদহ, খুনিয়াগাছের ৯৩০ হেক্টর ও একই উপজেলার ধরলা এবং রত্নাই নদীর বুকে জেগে ওঠা চর ফলিমারীতে ২২৫ হেক্টর, চর খারুয়া, বুমকা, বাঁশপচাই ২২০ হেক্টর, চরবুদারু, বিদ্যাবাগিস, কলাখাওয়া, বড়বাসুরিয়া, ছোট বাসুরিয়ার ৩৩০ হেক্টর জমিতে ফসল আবাদ হচ্ছে। এ উপজেলার গোকুন্ডা, খুনিয়াগাছ, রাজপুর ইউনিয়নে তিস্তা এবং মোগলহাট, বড়বাড়ী, কুলাঘাট ইউনিয়নে ধরলা ও রত্নাই নদীর বুকে ১৮টি চর রয়েছে। এসব চরের ৩ হাজার ৭ হেক্টর জমির মধ্যে ৩ হাজার ২৪০ হেক্টর জমিতে এখন বিভিন্ন ধরনের ফসল আবাদ হচ্ছে। আদিতমারী উপজেলায় তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠা কুটিবাড়ীর চরে ১৫, চর গোবর্দ্ধনে ৫০০, বারোঘড়িয়ায় ২৫, আরাজি ছালাপাকায় ২০০, দক্ষিণ বালাপাড়ায় ২০০ হেক্টর, চণ্ডীমারীতে ১২০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল আবাদ হচ্ছে। এছাড়া কালীগঞ্জ উপজেলার ১০টি চরে ১২১৭ হেক্টর জমিতে আবাদ হচ্ছে।

চর রুদ্রেশ্বরের বাসিন্দা কামরুজ্জামান বলেন, তিস্তার ভাঙনে সাতবার ভিটেমাটি হারিয়েছি। কঠোর পরিশ্রম করে এখন প্রায় সাত হেক্টর জমিতে ফসল আবাদ করছি। সেই ফসলের টাকায় নিজের বাড়ি পাকা করেছি। বড় মেয়েকে লালমনিরহাট সরকারি কলেজ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়েছি। মেজো মেয়ে নার্সিংয়ে পড়াশোনা করছে। ছোট ছেলে এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী।

তিনি বলেন, এখন অনেকেই কাঁচাপাকা বাড়ি তৈরি করছেন। আগের মতো চরে এখন আর অভাব নেই। অভাব একটাই, সেটা হলো আমাদের নদী শাসন, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সুবিধা না থাকা। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় ফসল উৎপাদন খরচ বেশি পড়ছে। তাছাড়া বাজারজাত করতেও সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

একই চরের কৃষক নুরুল হক, ফারুক হোসেন, আব্দুল মান্নান, হাবিবুর রহমান, আনসার আলী, আজিজুল ইসলাম বলেন, নদী শাসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করলে আমরা মূল ভূখণ্ডের কৃষকের থেকে আরো বেশি ভালো থাকব। কেউ আমাদের সঙ্গে ফসল উৎপাদনে পাল্লা দিতে পারবে না। 

কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ সিফাত জাহান বলেন, আগে তো চরের কৃষকদের নিয়ে কেউ ভাবেনি। বর্তমান সরকার চর কৃষি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে। সে লক্ষ্যে আমরাও মাঠ পর্যায়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি। চরের কৃষকদের ভাগ্য বদলে নিবিড় ফসল চাষে বিভিন্ন পরামর্শের পাশাপাশি সরকারি সুযোগ-সুবিধাও প্রদান করা হচ্ছে। তবে তাদের প্রকৃত উন্নয়ন করতে হলে প্রথমে তিস্তা নদী খনন ও শাসন জরুরি। এরপর সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং উৎপাদিত ফসল ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. শামসুজ্জামান বলেন, চরের জমিতে রাসায়নিক সার ছাড়াই কাঙ্ক্ষিত ফসল উৎপাদন হচ্ছে। আমরা চরের শস্য বিন্যাসের আওতায় নিয়ে আসতে কাজ শুরু করেছি। এখন চরগুলোয় সমন্বিত ফসল উৎপাদনে জোর দেয়া হবে।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামীম আশরাফ বলেন, আমরা চরকে কৃষির জন্য স্বর্গ বলি। চরের মাটি সমন্বিত সফল চাষের জন্য সোনার জমি। চরে যেমন এক সঙ্গে অনেক ফসল ফলানো যায়, ফলনও অন্যান্য জমির তুলনায় ভালো হয়। উৎপাদিত ফসলও মূল ভূখণ্ডের জমির তুলনায় অনেক বেশি দানাদার বা মানসম্পন্ন। তবে চরের সবকিছু ছাপিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা নদী শাসন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর বলেন, চরের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বর্তমান সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এরই মধ্যে চরের প্রত্যেক মানুষের জন্য সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে বিশেষ কাজ চলমান রয়েছে। তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতের আওতায় আনা হয়েছে। চরগুলোয় খাদ্যের অভাব নেই, তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা রয়েছে।