বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অস্বচ্ছতা, অনিয়ম, অপচয় ও অযৌক্তিক ব্যয় বন্ধ করে ভোক্তাবান্ধব সংস্কারের দাবি জানিয়েছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির দাবি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে নয়, বরং এ খাতে লুণ্ঠন ও অপচয় বন্ধ করেই ভোক্তাদের জন্য মূল্যহার কমানো সম্ভব।
আজ রোববার সকালে রাজধানীতে ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে লুণ্ঠন প্রতিরোধে গণবান্ধব সংস্কার চাই’ ব্যানারে মানববন্ধন করেছে ক্যাব। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ট্যারিফ নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানির আগে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনের সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
ক্যাব জানায়, গণশুনানির স্থানে মানববন্ধন আয়োজনের জন্য বিইআরসি কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। তবে অনুমতি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত শুনানির স্থানের সামনের সড়কের ফুটপাতে মানববন্ধন করতে হয়।
বক্তারা বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিন ধরে অস্বচ্ছতা, অদক্ষতা, অবৈধ মুনাফা ও বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত চার্জের কারণে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এর দায় জনগণের ওপর না চাপিয়ে প্রথমে খাতটির অনিয়ম, অপচয় ও অযৌক্তিক ব্যয় বন্ধ করতে হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কোনো বিলাসী পণ্য নয় উল্লেখ করে তারা বলেন, মানুষের জীবন ও অর্থনীতির জন্য এটি অপরিহার্য সেবা। তাই এ খাতকে মুনাফা অর্জনের মাধ্যম না বানিয়ে জনসেবা হিসেবে পরিচালনা করতে হবে।
নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, জনগণের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে বিইআরসি বারবার সরকার ও বিভিন্ন কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করে আসছে। দেশের বর্তমান সংকটের সময়েও কমিশন কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না। তিনি বিইআরসির কার্যক্রমের সমালোচনা করে কমিশনের সংস্কারের দাবি জানান।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় ভোক্তা ও জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে মুনাফাভিত্তিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেয়। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে জনগণের সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, সেখানে অতিরিক্ত বেসরকারিকরণের মাধ্যমে মানুষের ওপর আরো বোঝা চাপানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, গ্যাস ও বিভিন্ন উৎসের বিদ্যুৎ নিয়ে জনগণের সঙ্গে যেভাবে তামাশা করা হচ্ছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও যদি একই ধরনের অনিয়ম ও মুনাফাভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হয়, তাহলে এ খাত থেকেও জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল পাবে না।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, বিইআরসিকে বারবার জনবান্ধব হওয়ার আহ্বান জানানো হলেও ভোক্তাদের দাবিগুলো যথাযথভাবে আমলে নেয়া হয়নি। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো কেন মুনাফাখোরদের স্বার্থ রক্ষার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে, সেই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে।
ক্যাব যুব সংসদের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী অরিত্র রোদ্দুর ধর বলেন, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি পাওয়া জনগণের মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত। কিন্তু ক্যাপাসিটি চার্জসহ বিভিন্ন খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থের অপচয় হচ্ছে। এর দায় শেষ পর্যন্ত জনগণের ঘাড়ে বাড়তি বিল হিসেবে চাপানো হচ্ছে।
মানববন্ধনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কারে ১০ দফা দাবি তুলে ধরে ক্যাব। দাবিগুলো হলো—বিইআরসির স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আইনের কাঠামোগত সংস্কার; গণশুনানির ভিত্তিতে সব ধরনের নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের বেঞ্চমার্ক মূল্যহার নির্ধারণ; জ্বালানি অপরাধীদের বিরুদ্ধে ভোক্তাপক্ষের ফৌজদারি মামলা করার আইনগত অধিকার এবং ভোক্তাপক্ষের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার পরিবর্তনের প্রস্তাব করার অধিকার নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বেসরকারিকরণ বন্ধ, সরকারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেবা মুনাফামুক্ত করা, লুণ্ঠনমুক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যয় ও মূল্যহার সংস্কার এবং মূল্যহার না বাড়িয়ে লুণ্ঠন ও অপচয় বন্ধের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ভর্তুকি ও মূল্যহার কমানোর দাবি জানানো হয়।
এ সময় জ্বালানি খাতে অনিয়ম ও অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনারও দাবি জানায় সংগঠনটি।
ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ ও ট্যারিফ নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই ভোক্তা ও জনস্বার্থ উপেক্ষা করা যাবে না। বিইআরসিকে এখনই কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। ভোক্তা ও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় ক্যাবের দাবিগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে লুণ্ঠনমুক্ত ও জনবান্ধব করতে হবে।
মানববন্ধনে ক্যাব নেতারাসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, পরিবেশকর্মী, রাজনৈতিক নেতা ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।










