শেরপুর জেলায় সরকারি বনাঞ্চলের সীমানায় গড়ে তোলা হয়েছে বিপুলসংখ্যক করাতকল। জেলার তিনটি উপজেলায় প্রায় ১৭৫টি করাতকল রয়েছে। এসব করাতকলের ৮৪ শতাংশেরই অনুমোদন নেই। অন্যদিকে সরকারি বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও জেলার তিনটি উপজেলায় বনাঞ্চলের সীমানায় করাতকল আছে ৮৫টি। এসব করাতকলের বেশির ভাগই সরকারি বনের গাছ কেটে নিধন করছে। তবে এগুলো বন্ধে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। কিছু ক্ষেত্রে করাতকলগুলো টিকে থাকার পেছনে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাই জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
জেলা বন বিভাগ বলছে, জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় অন্তত ১৭৫টি করাতকল আছে। যার মধ্যে লাইসেন্স আছে মাত্র ২৮টির। বাকি ১৪৭টি চলছে অবৈধভাবে। তিনটি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা শ্রীবরদী উপজেলায়। শ্রীবরদী উপজেলায় মোট করাতকল আছে ৭৫টি। এর মধ্যে অনুমোদন আছে নয়টির, আবেদন আছে নয়টির। শ্রীবরদী উপজেলার বনসংলগ্ন রাণিশিমুল ইউনিয়নের সরকারি হিসাবেই বনাঞ্চলের মধ্যে ১৭টি করাতকল আছে।
নালিতাবাড়ী উপজেলায় মোট করাতকলের সংখ্যা ৭০টি। এর মধ্যে অনুমোদন আছে ১৫টির। আবেদন আছে আরো ১০টির মতো। ২০টি করাতকল বনাঞ্চলের সীমানার মধ্যে। ঝিনাইগাতী উপজেলায় করাতকলের সংখ্যা ৩০টির মতো। অনুমোদন আছে মাত্র চারটির। এ উপজেলার বনাঞ্চলের ধানশাইল এলাকায় বনের ভেতর আছে চারটি করাতকল।
জানা গেছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী করাতকল স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি এবং বন বিভাগ থেকে নিবন্ধন নিতে হয়। লাইসেন্স বাধ্যতামূলক হলেও কেউ মানছে না আইন। অবৈধ করাতকল নির্মাণ ও পরিচালনা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ফলে বনাঞ্চলের সীমানার মধ্যে যেখানে-সেখানে স্থাপন করা হচ্ছে করাতকল। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এসব কলে কাটা হয় সরকারি বনের গাছ। রাতের অন্ধকারে চোরাই পথে আসা গাছ দিয়ে চলছে অধিকাংশ সমিল।
শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় রয়েছে সরকারের সংরক্ষিত, রক্ষিত ও অর্পিত বিশাল বনাঞ্চল। সরকারের আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত, রক্ষিত ও অর্পিত বা অন্য যেকোনো ধরনের সরকারি বনভূমির সীমানা থেকে ন্যূনতম ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল (সমিল) স্থাপন করা যাবে না। করাতকল স্থাপনের আগেই সরকারি অনুমোদন নিতে হবে। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা, এর আগে বা পরে কোনো করাতকল পরিচালনা করা যাবে না। অথচ এ বিধি লঙ্ঘন করে ওই তিন উপজেলায় বনাঞ্চলের এক থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ৩০টি, ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ৫৫টি অবৈধ করাতকল রয়েছে। অবাধে বনের গাছ নিধন করে এসব করাতকলে কাটা হচ্ছে। এতে উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল। ভারসাম্য হারাচ্ছে পরিবেশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নেতাদের যোগসাজশে গড়ে উঠছে এসব করাতকল। তারা মাসোহারা নিয়ে অবৈধ করাতকলের কার্যক্রম চালু রাখছেন। ফলে প্রশাসন অভিযান চালালেও স্থায়ীভাবে এসব করাতকল উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সহকারী বন সংরক্ষক ড. প্রাণতোষ চন্দ্র রায় বলেছেন, লোকবল সংকট, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে ব্যবস্থা নিলেও আবার সে আগের অবস্থায় চলে আসে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের জন্য বারবার আবেদন করলেও প্রশাসনের ব্যস্ততার কারণে তারা সময় দিতে পারেন না। বনাঞ্চল থেকে করাতকল সরাতে জরুরি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা আক্তার বলেন, শিগগিরই করাতকল উচ্ছেদে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। তবে বিষয়টি শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত সমাধান করা সম্ভব নয়। আদালত পরিচালনার পাশাপাশি বন বিভাগকে অবৈধ করাতকল বন্ধের মাধ্যমে বনাঞ্চল রক্ষায় আরো সক্রিয় হতে হবে।










