অনেক স্থানে হারিয়ে যেতে বসেছে স্মৃতিচিহ্নগুলো। কোথাও কোথাও বধ্যভূমির ওপর স্থাপনাও গড়ে উঠেছে। অথচ বাঙালির সবচেয়ে গৌরবময় রক্তাক্ত ইতিহাসের মর্মন্তুদ স্মৃতিবিজড়িত অর্ধশতাধিক বধ্যভূমি রয়েছে প্রাচীনতম এ জেলায়।

মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য গৌরবময় ইতিহাসের পাদপীঠ প্রচীনতম জেলা যশোর। রক্তাক্ত রণাঙ্গনের নয় মাসের যুদ্ধ পেরিয়ে এ জেলা শত্রুমুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর। কিন্তু এর আগেই মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে গোটা যশোর জেলার ওপর পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসররা চালিয়েছিল হত্যাযজ্ঞ। বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবীসহ নিরীহ মানুষকে ধরে এনে হত্যা করা হয়েছে। শহরের অন্যতম বধ্যভূমি শংকরপুর রায়পাড়া এলাকায় হত্যা করা হয় অসংখ্য মানুষকে। সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হলেও অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকে সারা বছর। প্রতি বছর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানাতে আসে মানুষ। কিন্তু বছরের অন্য দিনগুলোতে বধ্যভূমির খোঁজ নেয়ার অবকাশ থাকে না।

এটি ছাড়াও যশোর শহর ও শহরতলি এলাকায় অন্তত ৫০টি বধ্যভূমি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম বিরামপুর, ধোপাখোলা, খয়েরতলা, যশোর সেনানিবাস, হর্টিকালচার সেন্টার, যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল, কোতোয়ালি থানা চত্বর, বকচর, মুড়লি মোড়, ব্যাপিস্ট চার্চ, রূপদিয়া নীলকুঠি, রেলস্টেশন মাদ্রাসা, চৌগাছার ডাকবাংলো, কপালিয়া খেয়াঘাট, খাজুরা বধ্যভূমি, বাঘারপাড়ায় চিত্রা নদীর তীরের বধ্যভূমি, অভয়নগরের ওয়াপদা ভবনের ভৈরব নদের তীরের বধ্যভূমি, কেশবপুরের মঙ্গলকোট ব্রিজ বধ্যভূমি, সীমান্তের মাশিলা গ্রাম বধ্যভূমি ও শার্শা থানা বধ্যভূমি।

শংকরপুর রায়পাড়ায় ওই সময়ের প্রতক্ষ্যদর্শীদের বিবরণে জানা যায়, শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাঙালিদের ধরে আনা হতো। ট্রেনে করেও অসংখ্য মানুষকে রায়পাড়া বধ্যভূমিতে নিয়ে আসা হতো। এরপর নির্যাতন চালিয়ে তাদের হত্যা করা হতো। সে সময় ওই এলাকা জঙ্গল ঘেরা এবং নির্জন ছিল।

শংকরপুরের বধ্যভূমির কথা রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধ কোষে (দ্বিতীয় খণ্ড)। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, দেশের অন্যতম বধ্যভূমি যশোরের শংকরপুর সরকারি হাঁস-মুরগি খামার। এ বধ্যভূমিতে বিহারিরা শত শত মানুষকে হত্যা করেছে। শহরের টপ টেরর বিহারি রংবাজরা বিভিন্ন জায়গা থেকে বাঙালিদের ধরে এনে এখানে গলা কেটে হত্যা করত। তারপর খামারের ভেতরে মুরগি রাখার ৪ ও ৫ নম্বর শেডে মরদেহ পুঁতে রাখা হতো। এ শেডের পাশে ছিল পাম্প হাউজ। এখানে বাঙালিদের গলা কেটে হত্যা করা হতো। খামারের ১১ নম্বর শেডের পাশে ছিল একটি কুয়া। মরা মুরগি ফেলার কুয়াটি ভরে গিয়েছিল বাঙালির মরদেহে।

ধোপাখোলা বধ্যভূমির বর্ণনা দিয়ে সরকারি তথ্য বাতায়নে উল্লেখ করা হয়েছে, কথিত আছে ধোপাখোলার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বজিত গাঙ্গুলী তার থ্রি নাট থ্রি রাইফেল দিয়ে আকাশ থেকে বিমানবন্দরে অবতরণরত যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বিরামপুরেও বেশ কয়েকটি গণহত্যা চালানো হয়। ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত হওয়ার পর বিরামপুরের একটি কুয়ার মধ্য থেকে ১০টি খুলি উদ্ধার করা হয়। আর ভৈরব নদের দড়াটানা ব্রিজের পাশেও ফেলা হয়েছে অনেক মুক্তিকামী মানুষের মরদেহ। ২০১০ সালেও যশোরের ঢাকা রোড বাবলাতলা ব্রিজসংলগ্ন ভৈরব নদের তীর থেকে বেশকিছু কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়রা জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই ব্রিজের নিচে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স মুজিব বাহিনীর (বিএলএফ) বৃহত্তর যশোর জেলার উপ-অধিনায়ক রবিউল আলম বলেন, ‘এগুলো বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের চিহ্ন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের নির্মমতার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে বধ্যভূমিগুলো। এগুলো সংরক্ষণ করা সম্ভব না হলে আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ভুলে যাবে।’