২০১৮ ও ২০২৩ সালে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) নির্বাচিত মেয়র তালুকদার আবদুল খালেকের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন। এজন্য ৮২৩ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেন তিনি। গত সাড়ে পাঁচ বছরে প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা খরচ করে নগরীর বিভিন্ন ড্রেন নির্মাণ ও সাতটি খাল খনন করা হয়েছে। এর পরও নিরসন হয়নি জলাবদ্ধতা।
আষাঢ়ের শুরুতেই ভারি বর্ষণে তলিয়েছে নগরের বিভিন্ন এলাকা। সোমবার রাতভর বৃষ্টিতে প্রধান সড়কগুলোয় জমেছে হাঁটুসমান পানি। নিম্নাঞ্চল ও অনেক এলাকার বাসাবাড়িতেও পানি ঢুকে পড়েছে।
নগরবাসী বলছেন, গত চার দশকে সব মেয়রই জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া প্রকল্প নিলে কোনো লাভ হবে না।
নগরের পিটিআই মোড়ের বাসিন্দা জাফর চৌধুরী বলেন, ‘একটু বৃষ্টি হলেই মোড়ের ছয়টি রাস্তা পানিতে তলিয়ে যায়। দুই বছর আগে করা উঁচু স্থানগুলোর কারণে পানি দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকে। রূপসা নদীতে ভাটা শুরু না হলে এ পানি সরে না। তখন নোংরা পানির মধ্যেই চলাচল করতে হয় আমাদের। প্রতি বর্ষায় নগরের এমন জলাবদ্ধতার জন্য সিটি করপোরেশনই দায়ী।’
মুজগুন্নি এলাকার মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ‘সড়ক ও নালার কাজ হলেও আমাদের ভোগান্তির কোনো কমতি হয়নি। বৃষ্টি হলেই নিচু এলাকা ডুবে যায়। সড়কটির পানি আবু নাসের হাসপাতাল ও নেভি স্কুলের মাঝখান দিয়ে যে নালা চলে গেছে, সেখান দিয়ে গিয়ে ময়ূর নদে পড়ে। নালা পাকা হয়ে যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে একসময় বড় একটি খাল ছিল। দখলের কারণে এটি এখন একটি নালায় পরিণত হয়েছে। এজন্য পানি নামতে পারছে না।’
অবশ্য নগর কর্তৃপক্ষ জানায়, কেসিসির একটি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৫৮ কিলোমিটার ড্রেন ও ২৩ কিলোমিটার খাল সংস্কার হবে। আর অন্য প্রকল্পে রাস্তা উন্নত করা হবে ৩০৩ কিলোমিটার। দুটি প্রকল্পেরই মেয়াদ ছিল ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। বর্ধিত মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা চলতি মাসে।
এ বিষয়ে কেসিসির প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসন একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রকল্পের আওতায় পাম্প স্টেশন ও স্লুইস গেট সংস্কারের মতো কিছু কাজ এখনো বাকি আছে। এগুলো শেষ হলে নগরবাসী প্রকল্পের সুফল পাবে।’
খুলনা আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, সোমবার দুপুর ১২টা থেকে গতকাল দুপুর ১২টা পর্যন্ত খুলনায় ৮৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটা চলতি বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে এবং ২০ জুন পর্যন্ত চলতে পারে।
এদিকে জলাবদ্ধতার কারণে গতকাল সকালে অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন। নগরের নতুন রাস্তা মোড় থেকে আবু নাসের হাসপাতাল এবং মুজগুন্নি সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এছাড়া আহসান আহমেদ রোড, রয়েল মোড়, খানজাহান আলী সড়ক, বাস্তুহারা, বাইতিপাড়া, চানমারী, লবণচরা ও টুটপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, রূপসা নতুন বাজারের মতো এলাকাগুলোয় প্রায় কোমরসমান পানি জমে যায়। খুলনা-যশোর মহাসড়ক ছাড়া শহরের প্রায় সব রাস্তাই পানির নিচে থাকতে দেখা যায়।
নগরবিদরা বলছেন, শত শত কোটি টাকা খরচ করে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও অপরিকল্পিত উন্নয়ন, খাল দখল ও নিয়মিত নালা পরিষ্কার না করায় এ দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। খুলনা নগরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম ২২টি খাল দখলমুক্ত ও সংস্কার না করা, নিয়মিত নালা পরিষ্কার না করা এবং জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়াতেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
খুলনা নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘ভৈরব ও রূপসা নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি নদীতে নামতে পারছে না, বরং জোয়ারের সময় শহরের পানি আরো বাড়ছে। এছাড়া নগরের পশ্চিমাঞ্চলের বিল পাবলা ও রায়ের মহলের মতো প্রাকৃতিক জলাধারগুলো আবাসন ব্যবসায়ীরা ভরাট করে ফেলায় বৃষ্টির পানি জমার আর জায়গা নেই।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘চার বছর আগে জেলা প্রশাসন ২৬টি খালে ৪৬০ জন দখলদারকে চিহ্নিত করলেও তাদের উচ্ছেদে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে চলা ময়ূর নদ খনন করা হলেও সেই মাটি নদীর পাড়ে রাখায় তা আবার নদীতেই ফিরে যাচ্ছে। এজন্য সামান্য বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।’










