স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়েছে বাংলাদেশ। ডিসেম্বরে উদযাপিত হবে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। সরকারি উদ্যোগে যেসব কোম্পানি দেশ ও জাতি গঠনে মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে তাদের নিয়ে আগামী চার মাস প্রতি রোববার বণিক বার্তার বিশেষ আয়োজন। আজ আশুগঞ্জ সার কারখানা

আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (এএফসিসিএল) উৎপাদন শুরু হয় ১৯৮৩ সালে। ওই সময় থেকে দেশের কৃষকদের নিরবচ্ছিন্নভাবে ইউরিয়া সারের জোগান দিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সুলভে সার উৎপাদনের মাধ্যমে অবদান রাখছে দেশের কৃষি অর্থনীতিতেও। আবার কম পরিচালন ব্যয় ও উৎপাদন দক্ষতার সুবাদে মুনাফাযোগ্যতাও ধরে রেখেছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) আওতাধীন প্রতিষ্ঠানটি।

পরিচালন ব্যয়ের আধিক্য ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনা—রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানাগুলোর প্রায় অধিকাংশকে নিয়েই এ দুই অভিযোগ শুনতে পাওয়া যায়। উপকরণ সংকট ও প্রতিযোগী সক্ষমতার অভাবে ধুঁকছে অনেক প্রতিষ্ঠান। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে অবস্থিত এএফসিসিএল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়মিতভাবে মুনাফা করে গিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সাম্প্রতিক সময়ে কারখানার আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে আসার পাশাপাশি গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ও মুনাফায় কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। যদিও সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা।

এএফসিসিএলের বার্ষিক সার উৎপাদন সক্ষমতা ৫ লাখ ২৮ হাজার টন। প্রতিষ্ঠার পরের দুই দশক প্রতি বছর সাড়ে চার লাখ টনের বেশি সার উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে বর্তমানে গ্যাস সংকট ও যন্ত্রপাতি পুরনো হয়ে যাওয়ার কারণে বার্ষিক উৎপাদন নেমে এসেছে দেড় থেকে দুই লাখ টনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের জোগান নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানার আধুনিকায়ন করা গেলে এ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এরই মধ্যে কারখানাটির ওভারহোলিং (সংস্কার) কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এজন্য যন্ত্রপাতি সার্ভিসিং ও প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কভিডের কারণে কিছুটা বিলম্বিত হলেও আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে যন্ত্রপাতির প্রতিস্থাপন শেষ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে এএফসিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম আনোয়ারুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, উৎপাদন, বিপণন, সরকারি কোষাগারে অর্থ প্রদান, কর্মসংস্থান, দেশের কৃষি অর্থনীতিতে অবদান ইত্যাদির মাপকাঠিতে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি দেশের অত্যন্ত সফল ও সুপরিচিত একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। অব্যাহত গ্যাস সংকট ও মেশিন সংস্কারের অভাবে বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকে চলে এসেছে। তবে যেসব যন্ত্রপাতি সচল রয়েছে সেখানে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ করা গেলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি সার উৎপাদন করা সম্ভব। স্বল্প ব্যয়ে উৎপাদনের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে দেশের সেরা সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে এএফসিসিএল।

১৯৮৩ সালে উৎপাদন শুরু করতে পারলেও এএফসিসিএল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে। ওই সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানের নির্দেশনার ভিত্তিতে আশুগঞ্জে একটি ইউরিয়া সার কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি (এএফসিসি) নামে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা করে ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে। কারখানার নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৭৬ সালে। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে তা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ হয় ১৯৮০ সালের অক্টোবরে। কারখানার পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয় ১৫ ডিসেম্বর ১৯৮১ সালে। তবে যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য কারখানা স্থিতিশীল উৎপাদনে পৌঁছতে পারেনি। ১৯৮৩ সালের জুলাইয়ে কারখানার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। বিসিআইসির ওপর কারখানার ভার ন্যস্ত হয় একই বছরের ডিসেম্বরে।

এ ধরনের একটি উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন রাসায়নিক সার কারখানার আয়ুষ্কাল ধরা হয় ২০ বছর। দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় আয়ুষ্কাল শেষে এর উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস পায়। এ প্রেক্ষাপটে কারখানার প্রতিষ্ঠাকালীন উৎপাদন সক্ষমতা অব্যাহত রাখতে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ও বিসিআইসির অভিজ্ঞ কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি আর্থকারিগরি সমীক্ষা করা হয়। এর ভিত্তিতে একটি প্রকল্প প্রস্তাব তত্কালীন পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। ১৯০ কোটি ২১ লাখ ৭০ হাজার টাকা ব্যয় ধরে করা প্রকল্পের ডিপিপি একনেকে অনুমোদন পায় ২০০৭ সালের ৩ মার্চ। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে যন্ত্রপাতির দাম বেড়ে যাওয়ায় এর বাস্তবায়ন বিঘ্নিত হয়। এরপর ৪৮১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দিয়ে প্রকল্পটি সংশোধিত আকারে একনেকে পাস হয় ২০১০ সালের জানুয়ারিতে। এরপর ২০১১ সালে কারখানাটির ওভারহোলিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়। তবে পুরনো যন্ত্রপাতির সবক’টি একক একটি ওভারহোলিং সিডিউলের অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। এছাড়া পরবর্তী সময়েও নতুন নতুন যান্ত্রিক সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস রেশনিংয়ের কারণে বছরে প্রায় পাঁচ-ছয় মাস কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন বন্ধ রাখায় কারখানার ছোট-বড় প্রায় সব যন্ত্র, যন্ত্রাংশ ও যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও বেড়েছে। এ অবস্থায় কারখানার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। তবে চলমান ওভারহোলিং কর্মসূচির আওতায় এসব সমস্যা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্প সচিব জাকিয়া সুলতানা বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে বিসিআইসির কারখানাগুলো নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেশেই উৎপাদনের মাধ্যমে সার সরবরাহ করতে কারখানাগুলোকে সংস্কার করা হচ্ছে। কয়েক বছর ধরেই যমুনা সার কারখানা ও আশুগঞ্জ সার কারখানা বেশ ভালো করছে। বর্তমানে যমুনা পুরোদমে চলমান থাকলেও আশুগঞ্জ সার কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ওভারহোলিংয়ে জোর দেয়া হয়েছে। এ কার্যক্রম বর্তমানে পুরোদমে চলমান। সংস্কার শেষ হলেই দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থায় আরো বড় অবদান রাখতে পারবে কারখানাটি।