মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে চলছে মণিপুরি সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব মহারাসলীলার শেষ প্রস্তুতি। এ উৎসব সফল করতে মণিপুরি গ্রামগুলোয় নিয়মিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী রাখাল ও রাস নৃত্যের মহড়া। একই সঙ্গে সাজসজ্জাসহ আনুষঙ্গিক কাজে ব্যস্ত মণিপুরিপাড়ার বাসিন্দারা। এছাড়া মহারাসলীলা উৎসব ঘিরে মণিপুরি কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটন ব্যবসা জমে উঠেছে। এরই মধ্যে অতিথি থাকার ঘরগুলোর বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। প্রতি বছর দেশ-বিদেশের কয়েক হাজার মানুষ ভিড় করে এ উৎসবে।

আয়োজকরা জানান, ধর্মীয় উৎসব মহারাসলীলা প্রতি বছর কার্তিক পূর্ণিমা তিথিতে অনুষ্ঠিত হয়। আগামী ৮ নভেম্বর কমলগঞ্জের মাধবপুর শিববাজার জোড়া মণ্ডপে মণিপুরি মহারাসলীলা সেবা সংঘের উদ্যোগে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সম্প্রদায়ের ১৮০তম মহারাস উৎসব অনুষ্ঠিত হবে।

অন্যদিকে রাস উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে আদমপুর মণিপুরি কালচারাল কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে মীতৈ মণিপুরি সম্প্রদায়ের ৩৭তম রাস উৎসব এবং আদমপুর তেতইগাঁও মধুমঙ্গল শর্মা মণ্ডপ প্রাঙ্গণে মণিপুরি সাংস্কৃতিক পরিষদের আয়োজনে সপ্তমবারের মতো রাস উৎসব অনুষ্ঠিত হবে।

এবারের রাস নৃত্যে তিন শতাধিক শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণী রাধাকৃষ্ণ, রাখাল, গোপী ও বৃন্দার ভূমিকায় অংশ নেবে। ধ্রুপদী নাচের শৈল্পিক আবহ ধরে রাখতে উপজেলার ১৮টি মণিপুরি গ্রামে চলছে নৃত্যের মহড়া।

উৎসবের দিন সকাল থেকে গোধূলী পর্যন্ত কৃষ্ণের বাল্যলীলা অনুসরণে হবে রাখাল নৃত্য। সন্ধ্যায় আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আর বিভিন্ন স্তরে রাতব্যাপী রাধাকৃষ্ণের রাসলীলা পরিবেশিত হবে মণিপুরি নৃত্যের ধ্রুপদ ভঙ্গিমায়। সেই আঙ্গিকে অংশগ্রহণকারীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

প্রশিক্ষকরা জানান, দুই সপ্তাহ ধরে গ্রামে গ্রামে অংশগ্রহণকারীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ধর্মীয় আচার হলেও এ উৎসব তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বহন করে। তাই নিখুঁতভাবে যাতে অংশগ্রহণকারীরা নৃত্য পরিবেশন করতে পারে সেদিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।  

আদমপুরের রাস পূর্ণিমা উদযাপন পরিষদ সূত্র জানায়, মণিপুরি কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনকে উৎসাহিত করতে এ বছর রাস উৎসবে অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। মহারাসলীলা মণিপুরিদের অনুষ্ঠান হলেও প্রতি বছর বর্ণিল এ উৎসবে শামিল হন দেশ-বিদেশের হাজারো দর্শনার্থী। আয়োজনকে সফল করতে চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে বলে জানান তিনি।

মণিপুরি কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজমের উদ্যোক্তারা জানান, কয়েক বছর আগে কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম যাত্রা করেছে। এখন পর্যন্ত আদমপুরের মাঝের গাঁওয়ের পাঁচটি পরিবার অতিথি রাখার জন্য প্রস্তুত হয়েছে। সব মিলে ৫০ জনের মতো অতিথি রাখার সক্ষমতা রয়েছে তাদের। কিন্তু রাস উৎসবকে কেন্দ্র করে অতিথিদের ব্যাপক সাড়া মিলছে। প্রায় ১৫ দিন আগেই তাদের নির্ধারিত কক্ষগুলো বুকিং শেষ হয়েছে। অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকায় নতুন করে বুকিং নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

মণিপুরি কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম উদ্যোক্তা কমিটির সভাপতি সুনীতি দেবী বলেন, তাদের পরিবারে ১০ জন অতিথি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। সব কক্ষ এরই মধ্যে বুকিং শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন অনেক অতিথি থাকার জন্য আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কিন্তু ব্যবস্থা না থাকায় তাদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। সব উদ্যোক্তা পরিবারের একই অবস্থা। এ খাতে আরো পরিবার যুক্ত করার কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

মণিপুরি মহারাসলীলা সেবাসংঘের সাধারণ সম্পাদক শ্যাম সিংহ বলেন, শুধু নিজস্ব আচার নয়, সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন আর অসাম্প্রদায়িক প্রতীক হয়ে উঠেছে মণিপুরিদের এ ধর্মীয় উৎসব।

জানা যায়, মণিপুরের মহারাজা ভাগ্যচন্দ্র সিংহ ১৭৭৯ সালে রাস উৎসব শুরু করেন। এরপর থেকে কার্তিক পূর্ণিমা তিথিতে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী মণিপুরিদের প্রধান ধর্মীয় মহোৎসব শ্রী কৃষ্ণের মহারাসলীলা পালিত হয়ে আসছে।