দেশের আর্থিক খাতে লুণ্ঠনের ধরনে ভিন্নমাত্রা সংযোজন করেছেন প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার)। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী পদে থেকেই লুটে নিয়েছেন অন্তত চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই)। এরই মধ্যে উন্মোচিত হয়েছে পি কে হালদারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা লুটেরা চক্রের অপকীর্তি। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে এ চক্র। পি কে হালদারের মতোই অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেডে (বিআইএফএফএল) লুণ্ঠন চালিয়েছেন এসএম ফরমানুল ইসলাম। প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ নির্বাহীর পদে থেকেই ৫৮৪ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার প্রধান আসামি হয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের আর্থিক খাতের পি কে হালদার এক-দুজন নয়। বরং সরকারি-বেসরকারি অনেক ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নীরবে লুণ্ঠন চালিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য পি কে হালদার। ধরা পড়া কেলেঙ্কারিগুলোর চেয়েও আরো বড় বড় অঘটন ঘটছে দেশের আর্থিক খাতে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা দেখেও না দেখার ভান করছে। সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর যখন কেলেঙ্কারিগুলো ধরা পড়ছে, তখন আর কিছুই করার থাকছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বিভিন্নব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে দেশের আর্থিক খাতে পি কে হালদারের মতো বেশ কয়েকজন তস্করের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এদেরই একজন দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এএমডি পদে থেকেও তিনি এমডিসহ পুরো ব্যাংকের প্রতিটি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। ব্যাংকে তার প্রধান দায়িত্ব হলো চেয়ারম্যানসহ পরিচালকদের নামে-বেনামে ঋণের জোগান দেয়ার ব্যবস্থা করা। বিনিময়ে অনিয়ম-দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ছেন তিনি।
রাষ্ট্রায়ত্ত শীর্ষস্থানীয় একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও পি কে হালদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে শীর্ষ নির্বাহী পদে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি নব উদ্যমে দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন। ১০-১৫ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে বড় গ্রাহকদের ঋণ পাইয়ে দিচ্ছেন। সরকার ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ বিতরণেও কমিশন বাণিজ্যে মেতেছেন। গুলশানে প্রধান কার্যালয় এমন একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীও ব্যাংকিং খাতের মাফিয়ায় রূপান্তরিত হচ্ছেন। নিজ ব্যাংকের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বড় গ্রাহকদের ঋণের নামে অর্থ লোপাটের ব্যবস্থা করাই তার দৈনন্দিন রুটিন।
চতুর্থ প্রজন্মের একটি ব্যাংক, যার বিনিয়োগের অর্ধেকই হয়েছে গুলশানের একটি শাখা থেকে। ৩ হাজার কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ করে সেখান থেকে তেমন কোনো মুনাফা দেখাতে পারছে না ব্যাংকটি। এ ব্যাংকের এমডি নিজের কুকীর্তি ধামাচাপা দিতে পরিচালনা পর্ষদকেও চাপে রেখেছেন।
প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের একজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ইশারাতেই চলছে ব্যাংকটির ঋণ প্রদান কার্যক্রম। ব্যাংকটির এডি রেশিও প্রায় শতভাগ। ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের সঙ্গে যোগসাজশ করে বড় অংকের কমিশনের বিনিময়ে ঋণ দেন বেশ কয়েকজন ডাকসাইটে এমডি। এসব ব্যাংক এমডিদের অনেকে বেশ আগেই তাদের পরিবারকে কানাডায় পাঠিয়ে দিয়েছেন।
রাষ্ট্রায়ত্ত একটি বিশেষায়িত ব্যাংকের একজন সাবেক এমডির আমলে দেয়া চার-পাঁচশ কোটি টাকার ঋণ এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। ফলে এখন তারল্য সংকটে ভুগছে ব্যাংকটি। তিনি এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে আছেন। যদিও তার অধীনে কাজ করা অনেক সৎ কর্মীই এখন জেলে রয়েছেন।
অপরাধীদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না বলে জানান দুদকের কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মোজাম্মেল হক খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আর্থিক অনিয়ম বা মানি লন্ডারিংয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দুদকের অবস্থান কঠোর। আর্থিক অপরাধের বিষয়ে দুদকের মানি লন্ডারিং ও গোয়েন্দা ইউনিট তত্পর রয়েছে। বেশকিছু আর্থিক অপরাধ প্রমাণে দুদক দেশের বাইরেও তথ্যের খোঁজে চিঠি পাঠিয়েছে। অপরাধীদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। আর্থিক অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতে দুদকের আইন ও বিধি অনুযায়ী সব রকমের ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া আর্থিক অপরাধে জড়িতরা যাতে সহজেই বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য সন্দেহভাজনদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও দেয়া হয়েছে।
দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একাধিক শীর্ষ নির্বাহী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও পি কে হালদারের দেখানো পথে হাঁটছেন। নামে-বেনামে নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ পুঁজিবাজার কারসাজিতে ব্যবহার করছেন তারা। একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের যোগসাজশে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল করার নেপথ্য কারিগরের ভূমিকা পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ব্যাংক ও আর্থিক খাতে পি কে হালদারই একমাত্র দস্যু নয় বলে মনে করেন বিএফআইইউ প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসানও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, অর্থ পাচারসহ যেকোনো আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পেলেই বিএফআইইউ থেকে তদন্ত করা হয়। তদন্ত পরিচালনা বিএফআইইউর রুটিন কাজ। বর্তমানেও আমরা বেশকিছু অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত পরিচালনা করছি। তবে তদন্ত পরিচালনার ক্ষেত্রে আমরা কঠোর গোপনীয়তার নীতি অনুসরণ করি। তদন্তে অনিয়ম-দুর্নীতি ধরা পড়লে বিএফআইইউ থেকে দুদকসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া শুরু হলে তখন বিষয়টি আর গোপন থাকে না। অর্থ পাচার প্রতিরোধসহ ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অনিয়ম ঠেকাতে বিএফআইইউ সজাগ রয়েছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের লুটপাটের অন্যতম নিদর্শন সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি। প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ২০১০-১২ সালের মধ্যে ব্যাংকটি থেকে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বের করে নিয়েছিল হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভির মাহমুদসহ প্রতারক চক্র। ঋণের নামে অর্থ লোপাটের ঘটনার ক্ষত পাঁচ বছর পরও শুকায়নি। বরং হলমার্কের কাছ থেকে টাকা আদায়ের সম্ভাবনা দিন দিন ক্ষীণ হয়ে আসছে। সোনালী ব্যাংকের তত্কালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবিরসহ একাধিক পরিচালকের যোগসাজশে দেশের ব্যাংকিং খাতের আলোচিত এ কেলেঙ্কারি সংঘটিত হয়েছিল। প্রায় একই সময়ে আলোচিত হয়েছিল বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারি। ব্যাংকারদের যোগসাজশে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকসহ দেশের বেসরকারি পাঁচটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা লোপাট করে আলোচিত গ্রুপটির কর্ণধাররা।
এরপর ২০১৩ সালে ধরা পড়ে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি। ২০০৯-১৪ পর্যন্ত তত্কালীন চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বে লুণ্ঠিত হয় ব্যাংকটি। এক্ষেত্রেও চেয়ারম্যানের সহযোগী ছিলেন বেসিক ব্যাংকের তত্কালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলাম। প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়ে ধুঁকছে দেশের উত্কৃষ্ট ব্যাংকের স্বীকৃতি থাকা বেসিক ব্যাংক। এননটেক্স গ্রুপের সাড়ে ৫ হাজার ও ক্রিসেন্ট গ্রুপের সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি নিয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে জনতা ব্যাংক। এক্ষেত্রেও পরিচালকদের সঙ্গে লুণ্ঠনের সহযোগী ছিল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
ব্যাংকিং খাত যখন একের পর এক কেলেঙ্কারিতে বিধ্বস্ত তখন অনেকটাই আলোচনার বাইরে ছিল দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এটিকেই সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে পি কে হালদারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দুষ্কৃতকারীরা। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেড থেকে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অন্তত ১০ হাজার ২০০ কোটি টাকা সরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে। এইর মধ্যে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। যদিও গ্রেফতার এড়িয়ে নির্বিঘ্নেই দেশান্তরী হয়েছেন পি কে হালদার। একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীর পদে থেকে একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লুণ্ঠন চালানোর ঘটনাটিকে নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, যেকোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব পরিচালনা পর্ষদ, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষক, বহির্নিরীক্ষক, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বহু ধাপ পেরিয়ে তবেই অর্থ ছাড় দেয়া হয়। এত কিছু থাকা সত্ত্বেও যেসব বড় বড় কেলেঙ্কারি হয়েছে, তা মেনে নেয়া যায় না। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সব পক্ষই দুর্নীতিগ্রস্ত হলে তবেই এ ধরনের আর্থিক অপরাধ সংঘটিত হতে পারে। পিকে হালদারের কেলেঙ্কারিসহ অন্যসব কেলেঙ্কারির সুষ্ঠু বিচার করতে হলে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবাইকেই বিচারের আওতায় আনা দরকার।










