১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও সাবলীল। রাজনৈতিকভাবে যেসব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা দরকার ছিল তার সবগুলোই বলেছেন।
৭ মার্চের ভাষণ শেষ হওয়ার পর অনেকেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল। তখন বিভিন্নজনের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া শুনছিলাম। কেউ বলছিলেন, শেখ মুজিব তো স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন না। তার সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়া দরকার ছিল। আবার কেউ কেউ বলছেন, ঘোষণা দিলেই তো স্বাধীনতা পাওয়া যাবে না, প্রস্তুতির দরকার আছে, বিচার-বিবেচনার দরকার আছে। শেখ মুজিব পিছিয়ে যাবেন না, যে বক্তৃতা দিয়েছেন তাতে পাকিস্তান রক্ষা করতে চাইলে করা যাবে, পাকিস্তানকে বিভক্ত করতে চাইলেও করা যাবে। ভাষণে শেখ সাহেব তার নিজের অসাধারণ রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। আরেকটি পক্ষ বলছিল, শেখ মুজিবের ভাষণে পাকিস্তানি মিলিটারি ক্ষেপে যাবে, শহরে খুনোখুনি হবে, গোলাগুলি হবে। আমরা ঢাকার বাইরে চলে যাব। সেদিন অনেকেই বক্তৃতা শুনে ঢাকার বাইরে চলে গেছে।
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু এত শক্তিশালী বক্তৃতা কীভাবে দিতে পারলেন তার কারণ যদি খুঁজি তাহলে দেখব জনগণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। জনসমর্থন নিয়েই তিনি রাজনীতি করে এসেছিলেন। এ কারণে তাদের মনের বাসনা সহজভাবে ধরতে ও প্রকাশ করতে পেরেছিলেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যেকোনো কাজ করা যায়, জনগণের বিরুদ্ধে গেলে তার ফল ভালো হয় না।
বঙ্গবন্ধু তার নিজস্ব স্টাইলে বক্তৃতা দিয়েছেন, যা উপস্থিত জনতা পছন্দ করেছে। আসলে বঙ্গবন্ধুও তার সামনে উপস্থিত জনতাকে চিনতেন, বুঝতেন, তেমনি উপস্থিত জনতাও বঙ্গবন্ধুর ভাষণটা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।
মনে রাখতে হবে যেকোনোভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। শেখ মুজিব যেহেতু মাঠের নেতা ছিলেন তাকে বিচার-বিবেচনা করেই কথা বলতে হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে তখন সব দিক দিয়েই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন শেখ মুজিব। ছিলেন অগ্রসর চিন্তার সবচেয়ে জনসম্পৃক্ত নেতা। তার অসাধারণ নেতৃত্ব গুণ তখন সুবিদিত। যেকোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত সময়ের মধ্যে তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারতেন। ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যেও তার বিচার-বিবেচনার ছাপ স্পষ্ট। আমাদের নিজস্ব শক্তি-সামর্থ্য কেমন, শত্রুপক্ষের শক্তি-সামর্থ্য কেমন তা আমলে নিয়েই ওই ভাষণটি দিয়েছিলেন।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে দুটি আসন ছাড়া সবক’টি আসনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছিল। এ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হয়েছে। ১৯৭১ সালের শুরুর উত্তাল দিনগুলোয় ইয়াহিয়া, ভুট্টোর সঙ্গে সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হলে স্পষ্ট হয়ে যায় আলোচনায় ফল মিলবে না। এ অবস্থায় শেখ সাহেব ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভার ডাক দিয়েছিলেন। সামনে কী করণীয় সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেয়ার ইঙ্গিত দেয়া হয়। জনগণের জাগরণ, আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ, আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের সমর্থন, শেখ মুজিবকে এত শক্তিশালী বক্তৃতা দেয়ার সাহস জুগিয়েছে।
এমনিতেই তিনি শক্তিশালী বক্তৃতা দিতেন কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে ৭ মার্চের ঘটনাটি ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি। সব দিক বিবেচনা করে শেখ মুজিব যে বক্তব্যটি দিয়েছেন, তা ছিল অনেক শক্তিশালী ও কার্যকর। শেখ মুজিবের এ বক্তৃতার পর ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। তার সঙ্গে ভুট্টোও আসেন। তাদের সঙ্গে শেখ মুজিবের কয়েকদিন বৈঠক হয়েছে। শেষ দিন বৈঠক সম্পর্কে শেখ সাহেবকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়েছে কিনা। তিনি বলেছিলেন, ‘অগ্রগতি না হলে কি এতদিন আলোচনায় থাকতাম!’ এ কথা শোনার পর সাংবাদিকরা এবং পরে যারা সংবাদপত্র পড়েছিলেন তারা ধরেই নিয়েছিলেন যে আপস নিষ্পত্তি হয়েছে। আর তাজউদ্দীন সাহেব বলেছেন, ‘আমাদের যা কিছু বক্তব্য, তা লিখিতভাবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে জানানো হয়েছে।’ শেখ মুজিবুর রহমান, কামাল হোসেন, তাজউদ্দীন আহমদসহ আরো কয়েকজন ছিলেন বৈঠকে। ব্যাপারগুলো এভাবেই হয়েছে। কিন্তু সারা দেশে সবাই তো আর জানত না। আমি ব্যক্তিগতভাবে আগ্রহী ছিলাম বলে জানতে পেরেছি। এ বাস্তবতার মধ্যে ২৬ মার্চ চলে আসে। তখন দিবাগত রাতে মিলিটারি অপারেশন আরম্ভ হলো—অপারেশন সার্চলাইট। ৭ মার্চের আগের ঘটনাবলি, ৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে শেখ মুজিবের পেছনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের একচ্ছত্র সমর্থন দেখব। এ কারণে তার পক্ষে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভবপর হয়েছিল।
আবুল কাসেম ফজলুল হক
সাবেক অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়










