প্রান্তিক পর্যায়ে সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মাধ্যমে ডিজিটাল সেন্টারের মতো আরো কিছু কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তবে পরিষদের যে ভবন রয়েছে, সেখানে চলমান সেবা দিতেই হিমশিম খেতে হয়। নতুন করে সেবা যুক্ত হলে বাড়াতে হবে কক্ষের সংখ্যা। এদিকে বিদ্যমান ইউপি ভবনগুলো নির্মাণ হয়েছে দ্বিতল ভিতের ওপর। সেগুলো ওপরের দিকে সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। ভূমির সংকট থাকায় বাড়ানো যাবে না পাশেও। তাই বিকল্প না থাকায় ভেঙে আবার নতুন করে নির্মাণ করতে হতে পারে এক দশকের মধ্যে তৈরি ৯৯৩ ইউপি ভবন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নকশার দুর্বলতার কারণেই অর্থ অপচয়ের এ শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশে বর্তমানে ইউপি রয়েছে ৪ হাজার ৫৭১টি। স্থানীয়দের বিভিন্ন সেবা দিতে প্রথম পর্যায়ে ১৯৯৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে ২ হাজার ৪২৩টি ইউপি ভবন নির্মাণ করা হয়। ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া হয় আরো ১ হাজার ৩১টি ভবন নির্মাণের। তবে ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা থাকায় ৩৮টি বাদে বাকি ৯৯৩টি ইউপি কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করা হয়েছে গত এক দশকে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে কাজ শুরু হলেও দুই দফা সংশোধনীর পর ২০২১ সালে ৯০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় এসব দ্বিতল ভবন। দেশের ৩৯৬টি উপজেলায় ২৫ শতক জমির ওপর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ভবনগুলো নির্মাণ করে। প্রথম পর্যায়ে এসব ভবন নির্মাণে অবশ্য ৫০ শতক জমির শর্ত ছিল।
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করে সেবা সম্প্রসারণ ও এক ছাদের নিচে সব সরকারি সেবা নিয়ে আসার জন্যই এসব কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পরিষদ ভবন থেকে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সনদ দেয়া থেকে শুরু করে সামাজিক নিরাপত্তার ভাতা, গ্রাম আদালত, ডিজিটাল সেন্টারে ই-সেবা, ব্যাংক সুবিধা ও স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়। রয়েছে যুব উন্নয়ন, কৃষি ও প্রাণিসম্পদসহ বিভিন্ন দপ্তরের অফিস। সরকারের উপজেলা ও ইউনিয়ন মাস্টারপ্ল্যানের আলোকে ভবিষ্যতে খাতভিত্তিক প্রশিক্ষণ, গ্রোথ সেন্টারসহ কর সংগ্রহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও যুক্ত করা হবে ইউপিকে। সময়ের সঙ্গে সোলার সিস্টেম, বায়ু গ্যাস কার্যক্রমসহ আরো কিছু সেবা ও সুবিধা যুক্ত হবে। তখন এসব ভবন সম্প্রসারণ জরুরি হয়ে পড়বে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্প প্রণয়নের সময় সম্প্রসারণের বিষয়টি হয়তো মাথায় ছিল না। এখন নতুন করে সম্প্রাসরণ করতে গেলে আবার সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখতে হবে। জায়গা থাকলে পাশে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। তা না হলে নতুন স্থানে আবার ভবন করতে হতে পারে।’
ইউপি ভবন নির্মাণের প্রকল্পটি নিয়ে সম্প্রতি একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন দিয়েছে সরকারের প্রকল্প মনিটরিংয়ের একমাত্র প্রতিষ্ঠান আইএমইডি। এতে অবকাঠামোর নকশাগত দুর্বলতা উঠে এসেছে। দ্বিতল ভিতের ওপর এসব ভবন নির্মাণ করায় ভবিষ্যতে এগুলো ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রাসরণের কোনো সুযোগ নেই বলে সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। আইএমইডি এও বলেছে, দেশের সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি কার্যক্রম আরো বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে ভবনগুলো ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ ছাড়া বিকল্প নেই। তাছাড়া এসব ভবনে ইউপি সদস্যদের কক্ষ ছোট ও নারী সদস্যদের জন্য আলাদা টয়লেটও রাখা হয়নি।
বিভিন্ন ইউনিয়নের সদস্য ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। নরসিংদীর মনোরহরদী উপজেলার শুকুন্দী ইউপি সদস্য মো. আবু তাহের মোল্লা জানান, তাদের ভবনে ইউপি সদস্যদের জন্য আলাদা কোনো কক্ষ বরাদ্দ নেই। তাই তারা চেয়ারম্যানের কক্ষে বসেই কাজ করেন। এর মধ্যে সরকারি সেবা বাড়লে ভবন সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। একই অভিমত চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কোদালা ইউপি চেয়ারম্যান মো. আবদুল কাইয়ুমের। ভবন সম্প্রসারণের পাশাপাশি লোকবল বাড়ানোর কথাও জানান এ জনপ্রতিনিধি।
অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ভবনের আয়ুষ্কাল থাকে ৪০-৫০ বছরের মতো। সেক্ষেত্রে ইউপি ভবনগুলো সম্প্রসারণের সুযোগ না রাখা দূরদর্শিতার অভাব। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। একটি ভবনের মেয়াদ থাকে অর্ধশত বছর। সেখানে আরো ফাউন্ডেশন দেয়া থাকলে সম্প্রসারণের সুযোগ থাকত। সেবা সম্প্রসারণের কথা মাথায় রেখে ভবিষ্যতের চাহিদা চিন্তা করে পরিকল্পনা করলে আজ ভবন ভাঙার বিষয়টি আসত না। এসব দ্বিতল ভিতের ওপর আবার তিনতলা করতে গেলে ঝুঁকির শঙ্কা রয়েছে।’
ভবন না ভেঙে সম্প্রসারণের কোনো সুযোগ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারি বলেন, ‘এটা করতে গেলে মাটি পরীক্ষা করতে হবে, ভিত্তি পরীক্ষা করতে হবে। এরপর যদি সম্প্রসারণের সুযোগ থাকে তাতেও ব্যয়টা বেশি হবে।’
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরও বলছে, এসব ইউপি ভবন ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে সে কাজ কীভাবে হবে তা এখনো নিশ্চিত নন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে এলজিইডির পরিকল্পনা, ডিজাইন ও গবেষণা ইউনিটের দায়িত্বে থাকা মো. আলি আখতার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিষয়টা নিয়ে কোনো পলিসি বা ডিজাইন করা হয়নি। যখন প্রয়োজন হবে তখন দেখা যাবে।’ তবে দ্বিতল ভবনের ভিতের বিষয়ে জানতে চাইলে এ নিয়ে তিনি কথা বলতে চাননি।
সময়ের সঙ্গে সেবা বাড়ছে, তাই ইউপি ভবনগুলোকে ভবিষ্যতে সম্প্রসারণ করতে হবে বলে মনে করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানও। তবে তিনি মনে করেন, দুইতলার ফাউন্ডেশনের ভবনকে কীভাবে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে তা প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে কথা বলেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইএমইডির প্রতিবেদন নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘তারা তাদের নিজস্ব মতামত দিতেই পারে।’
দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য সরকারের প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ ভবনই প্রথম পর্যায়ে কয়েক তলা ভিতের ওপর এক-দুইতলা নির্মাণ করা হয়, যাতে চাহিদা অনুযায়ী ধাপে ধাপে তা সম্প্রসারণ করা যায়। একইভাবে ইউপি কমপ্লেক্স ভাবনগুলোও নির্মাণ করা যেত কিনা জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, ‘অবশ্যই করা যেত। তবে স্কুল আর স্থানীয় সরকারের কাজ করে দুটি আলাদা সংস্থা। তাই তাদের মধ্যে বিভাজিত চিন্তা ও যোগাযোগের গ্যাপও থাকতে পারে।’










