পশুর নদ খনন করে উত্তোলিত বালু ফেলাকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসী ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। উত্তোলিত বালু কৃষিজমিতে ফেলানো হচ্ছে বলে অভিযোগ কৃষকদের। এতে ফসল উত্পাদনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। প্রতিবাদে মিছিল-সমাবেশের পাশাপাশি রাত জেগে জমি পাহারা দিচ্ছেন কৃষকরা।
জানা গেছে, মোংলা বন্দরকে সচল রাখতে পশুর নদ খননের কাজ চলছে। সেখান থেকে উত্তোলিত বালু ফেলা হয়েছে মোংলার চিলা এলাকার জমিতে। বাকি বালু ফেলার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে খুলনার দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ইউনিয়নের ৩০০ একর কৃষিজমিতে। যা এখন পশুরপাড়ের মানুষের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এতে ফসল উত্পাদনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির শিকার হতে হবে তাদের। তিন ফসলি জমি পতিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষি-নির্ভরশীল হাজারো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যে কারণে জমি রক্ষার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এলাকাবাসী। তারা মিছিল-সমাবেশের পাশাপাশি এখন রাত জেগে জমি পাহারা দিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর তারা আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। বরং বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের সহায়তায় জমিতে বালু ভরাট করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। এ প্রক্রিয়া শেষ করতে ক্ষেত্রবিশেষে জোর করে নোটিশে স্বাক্ষরচেষ্টা এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন থেকে কৃষকদের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
বানিশান্তা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুদেব কুমার রায় বলেন, এ ইউনিয়নের কৃষিজমিতে আষাঢ থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত আমন ধান, পৌষ থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত তরমুজ, বৈশাখ থেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত আউশ ধান ও অন্যান্য রবি ফসলের চাষ হয়। এ জমিতে পশুর নদ খননের বালু ফেললে এলাকার অন্তত পাঁচটি গ্রাম-বানিশান্তা, আমতলা, ভোজনখালি, খাজুরা, ঢাংমারি গ্রামের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া আশঙ্কা রয়েছে। একারণে কৃষক ও কৃষিরস্বার্থে এ প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয়রা আরো জানান, গতকাল শনিবার সকালে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তফা কামালসহ একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসার খবরে বানিয়াশান্তা ইউনিয়নের কয়েকশ নারী-পুরুষ জড়ো হন সেখানে। এসময় তারা বন্দর কর্তৃপক্ষের হুকুমদখলের সাইনবোর্ড দেখে তেড়ে যান। তাদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়তে থাকেন ইট-পাটকেল। গ্রামবাসীর তোপের মুখে একপর্যায়ে অবস্থান ত্যাগ করেন নৌ-সচিবসহ প্রতিনিধি দল।
পরে বিকেলে মো. মোস্তফা কামাল সংবাদিকদের বলেন, কিছু এনজিও এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য এ এলাকায় খননের মাটি না রাখতে আমার কাছে আবেদন দিয়েছেন। আমি এলাকা দেখে এসেছি। যারা উচ্ছৃঙ্খলতা দেখাচ্ছে তারা জমির মালিক নন, তারা অ্যাক্টিভিস্ট। নৌ-পরিবহন সচিব বলেন, জমির মালিকদের বেশিরভাগই চাচ্ছেন তাদের জমি একটু উঁচু হোক।
এরআগে গত ২৮ জুলাই বন্দরের লোকজন হুকুমদখলের জন্য জমিতে সাইনবোর্ড বসাতে গেলে এলাকাবাসীর প্রতিরোধে তা ব্যর্থ হন। ৯ আগস্ট বানিশান্তার আমতলা ক্যাম্প এলাকার গ্যাস ফ্যাক্টরি ঘাট দিয়ে খননযন্ত্র তোলার চেষ্টা করা হয়। ওই সময়ও বাধার মুখে তা পাড়ে তুলতে পারেননি বন্দরের লোকজন। সবমিলিয়ে সপ্তাহ দুই ধরে এলাকাবাসী ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিন্টু বিশ্বাস বলেন, মোংলা বন্দরকে জমি বুঝিয়ে দেয়ার পর অন্য কার্যক্রম শুরুর জন্য আমরা একদিন সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু আন্দোলনের মুখে ফিরতে হয় আমাদের। কৃষকদের হুমকির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো মিথ্যা।
দাকোপের বাসিন্দা সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য গ্লোরিয়া ঝর্ণা সরকার বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ বন্দর নিয়ে অর্থনৈতিক জোনের স্বপ্ন দেখছেন। এখানে আমাদের বালুও খনন করতে হবে, আবার তিন ফসলি জমিও রক্ষা করতে হবে। একটু সময় নিয়ে দেখেশুনে বিকল্প একটি জায়গায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ পঞ্চানন বিশ্বাস বলেন, উন্নয়নের স্বার্থে মোংলা বন্দর চ্যানেল খনন দরকার। কিন্তু খননের বালু কৃষিজমিতে কোনোভাবেই ফেলতে দিতে রাজি নই।
উন্নয়নের স্বার্থে এ কৃষিজমি দরকার হচ্ছে মন্তব্য করে মোংলা বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মুসা বলেন, মোংলা এলাকায় ৭০০ একর জমিতে বালু ফেলা হয়েছে। আরো ৩০০ একর দরকার। পশুর নদের পূর্বপাড়ে বালু ফেলার জায়গা নেই। কারণ সেখানে সব কল-কারখানা। তাই পশ্চিমপাশে বানিশান্তা এলাকায় জমির দরকার পড়েছে।
তিনি বলেন, স্থানীয়দের আন্দোলনে জমির মালিকরা নেই, বরং সবাই বহিরাগত। বন্দর সচল রাখার জন্য বন্দরকে আরো কার্যকর করার জন্য পশুর নদ খনন জরুরি। তাছাড়া মোংলা বন্দরের উন্নয়ন হলে এর উপকারভোগী তো এ অঞ্চলের মানুষই হবে। বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, এ ব্যাপারে দেড় বছর আগে থেকেই আমরা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলছি। আর আমরা তো জমি অধিগ্রহণ করছি না, ২ বছরের জন্য হুকুমদখল। এরপর তারা তাদের জমি ফেরত পাবেন। ১০ বছরের ক্ষতিপূরণের অর্থও পাচ্ছেন তারা।
এ বিষয়ে খুলনা জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের আমরা ক্ষতিপূরণের টাকা নেয়ার জন্য নোটিশ দিয়েছি। তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হয়ে হচ্ছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে শিগগিরই সমাধান হবে।










