চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বহদ্দারহাট বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খননের উদ্যোগ নেয়া হয় ২০১৪ সালে। কিন্তু আট বছর পার হলেও তিন কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের খাল খনন কার্যক্রমের কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এদিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না থাকায় সম্প্রতি এক বৈঠকে এ বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস। আট বছরে একটি খাল খননে সিটি করপোরেশন ব্যর্থ হওয়ায় সড়ক ও জনপথে (সওজ) অধিদপ্তরে আস্থা রাখতে চায় সরকার। তাই সরকার সেখানে একজন দক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বিষয়েও চিন্তাভাবনা করছে।

এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ এ খাল খনন নির্ধারিত সময়ে শুরু করতে না পারায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। চসিকের তথ্য অনুযায়ী, খালটির কাজের অগ্রগতি ২০ শতাংশের কাছাকাছি। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরা বলছেন, ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা এবং অর্থছাড়ের দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাজ শুরু নিয়ে এতটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে চলতি বর্ষা মৌসুম শেষ হলেই বারইপাড়া খাল খননের কাজ পুরোদমে শুরু হবে।

চসিকের তথ্যমতে, ২০১৪ সালের ২৪ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বহদ্দারহাটের বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৮৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে ১৩ আগস্ট প্রকল্পটির প্রশাসনিক অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২৬ কোটি ৮৪ লাখ ৮১ হাজার টাকা। এ সময় সংশোধিত প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০১৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। ২০১৭ সালের জুনে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এ সময়ে কাজই শুরু করতে পারেনি চসিক। সর্বশেষ গত ১৯ এপ্রিল পঞ্চম দফায় ব্যয় বাড়িয়ে ১ হাজার ৩৬২ কোটি ৬২ লাখ টাকা অনুমোদন দেয় একনেক। নতুন করে সময় বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ ধরা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় প্রকল্পটিতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ।

চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৯৯৫ সালে প্রণীত ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানে তিনটি নতুন খাল খননের সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে বহদ্দারহাটের বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল ছিল একটি। ২০১১ সালে প্ল্যানে থাকা এই খালটি খননের উদ্যোগ নেয় সিটি করপোরেশন। খালটির দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৯৭ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৬৫ ফুট হওয়ার কথা রয়েছে। খালের উভয় পাড়ে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ ও ২০ ফুট প্রস্থের সড়ক তৈরির পরিকল্পনা আছে নকশায়।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন খাল খননের জন্য ২৫ একর জমি অধিগ্রহণে শুরুতে ২২৪ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। পরে প্রকল্পটিতে শুধু জমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। যার মধ্যে সরকার ৯১৪ কোটি টাকা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দিয়েছে। ২০১৪ সালে চসিক মেয়র মো. মনজুর আলম প্রকল্পটির অনুমোদন করলেও কাজ শুরু করতে পারেননি। এমনকি অর্থসংকটের জটিলতায় সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনও প্রকল্পটির কাজ শুরু করতে পারেননি।

এদিকে গত ১৩ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে চট্টগ্রাম বিভাগের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি বিষয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় খালটি নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আলোচনা করা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস খাল খনন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি সে সময়ে ৬ শতাংশ হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। চসিক এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। সে সময় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সওজ অধিদপ্তর থেকে একজন দক্ষ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের নির্দেশ দেন তিনি।

জানা গিয়েছে, প্রকল্পের ২৫ একর ভূমির মধ্যে গত ডিসেম্বরে দুই ধাপে ১০ একর ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা সম্পন্ন করার কাজ চলমান আছে। মূলত জমি নিয়ে মামলা থাকায় অধিগ্রহণ কাজটি সম্পন্ন করা যায়নি। অন্যদিকে অধিগ্রহণ করা জমির মালিকদের অনেককে এখনো ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব হয়নি। যার কারণে সব জমি দখলে নিতে পারেনি চসিক। তবে সওজ অধিদপ্তর থেকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গে চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক ফরহাদুল আলম জানান, ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। খাল খননের কাজ, সাইড ওয়াল নির্মাণের কাজ চলমান। সর্বশেষ তথ্যমতে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ২০ শতাংশ বলে জানান তিনি।

সার্বিক প্রসঙ্গে চসিক মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, প্রকল্পটি আমি যখন দায়িত্ব নিয়েছি তার পরই কাজ শুরু করা হয়েছে। অর্থছাড়, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে খালটির খননকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। আমাদের জমি অধিগ্রহণ কাজ চলছে। যেসব জায়গা খালের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে, সেখানে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণসহ কিছু জায়গায় খননকাজ করা হয়েছে। নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে এ খাল খনন করা খুবই জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বারইপাড়া খালটি খনন করা হলে নগরীর বহদ্দারহাট, নাসিরাবাদ, শুলকবহর, বারইপাড়া, বাদুড়তলা, চান্দগাঁও, বাকলিয়া ও চাক্তাই এলাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা বেশ কমে যাবে। তাছাড়া এসব এলাকার ১০ লক্ষাধিক মানুষ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে। তাই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা জরুরি। দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ এলাকায় প্রতি বছর জলাবদ্ধতার কারণে ভোগ্যপণ্যের যে ক্ষয়ক্ষতি হয় সেটিও কমে যাবে। এর মাধ্যমে ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে মনে করেন তারা।

নগর পরিকল্পনাবিদ সুভাষ বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, সিডিএর ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী এ খাল খননের কথা থাকলেও সেটা হয়নি। খালটি খনন করা হলে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনসহ খাতুনগঞ্জের জলাবদ্ধতা সমস্যা লাঘব হবে। প্রকল্প প্রণয়নের দীর্ঘসূত্রতার কারণে আজও খাল খনন করা সম্ভব হয়নি। এ দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্প ব্যয় অনেক বেড়ে গিয়েছে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকার।