বরিশাল বিভাগে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়-আঁচড়ে আক্রান্তের সংখ্যা। চলতি বছরের ১-২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ হাজার ৫২০ জন কুকুর-বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে ভ্যাকসিন নিয়েছেন বলে জানিয়েছে বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে আক্রান্তদের বেশির ভাগই সরকারি হাসপাতালে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন না পেয়ে হতাশ হচ্ছেন। বাইরের ফার্মেসিগুলোতেও তেমন একটা মিলছে না জরুরি এ প্রতিষেধক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০ ডিসেম্বর থেকে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলায় কুকুর-বিড়ালসহ প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্তদের জন্য একমাত্র ভরসা বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল। শুধু নগরী নয়, বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকেও প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে ভ্যাকসিন নিতে আসেন। ভ্যাকসিনের মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগীরা। এছাড়া ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলার কোথাও সরকারি হাসপাতালে মিলছে না ভ্যাকসিন।
বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের তথ্য বলছে, দিনে গড়ে তিন শতাধিক মানুষ কুকুর ও বিড়ালের কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে ভ্যাকসিন নিতে হাসপাতালে আসছে। ২০২৪ সালে যেখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষ ভ্যাকসিন নিয়েছিল, সেখানে চলতি বছরের ২০ ডিসেম্বরের মধ্যেই সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজারে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশ বিড়ালের কামড় কিংবা আঁচড় নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এর সংখ্যা ১৬ হাজার ৬৬৫। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ৪৯ জন বিড়াল, কুকুর, ইঁদুর, ছুঁচো, বাদুড়, শিয়ালের কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। যদিও চিকিৎসকরা বলছেন, অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে বিড়ালের কামড় কিংবা আঁচড়ে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া কুকুরের কামড় কিংবা আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে ওই বছর ৩ হাজার ৯০৩ জন জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিয়েছেন। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন কুকুরের কামড় কিংবা আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার প্রায় সব সরকারি হাসপাতালেই জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন সংকট চলছে। রোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, সে তুলনায় পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকায় চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। দ্রুত সংকট কেটে যাবে।’
চিকিৎসকরা বলছেন, জলাতঙ্কে আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তি র্যাবিস ভাইরাসে সংক্রমিত হয়। ধীরে ধীরে এ ভাইরাস প্রান্তীয় স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ফলে গলবিল ও খাদ্যনালির মাংসপেশির কাজ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুও আক্রান্ত হয়। সাধারণত কামড়ানোর দুই-তিন মাসের মধ্যে জলাতঙ্ক রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। তবে এ সময়সীমা এক সপ্তাহ থেকে এক বছর পর্যন্তও হতে পারে।
জলাতঙ্কে আক্রান্ত ব্যক্তি পানি দেখলে ভয় পায়। পানি বা খাবার গিলতে তাদের কষ্ট হয়। পিপাসা পেলেও পানি দেখলেই আতঙ্কিত ও ভীত হয়ে পড়ে। আলো-বাতাসের সংস্পর্শে এলে এ ভীতি আরো বেড়ে যায়। তাদের আচরণেও কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। খিঁচুনিসহ মুখ থেকে অতিরিক্ত লালা নিঃসৃত হয়। বিনা প্ররোচনায় অন্যকে আক্রমণ বা কামড় দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। চিকিৎসা না পেলে এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুও হতে পারে।
কুকুর ও বিড়ালের কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া উদ্বিগ্ন করে তুলেছে চিকিৎসকদের। তবে সরকারি হাসপাতালে ভ্যাকসিন না পেয়ে প্রতিদিন শত শত রোগী ফিরে যাচ্ছেন। ভ্যাকসিন না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়া রোগীদের একজন বরিশাল নগরীর ফকিরবাড়ি রোডের বাসিন্দা তাসরিন জাহান।
তিনি বলেন, ‘বিড়াল আঁচড় দেয়ায় ভ্যাকসিন নিতে সদর হাসপাতালে এসেছিলাম। কিন্তু এসে জানতে পারলাম ভ্যাকসিন নেই। সরকারি হাসপাতালে এমন সংকট দুঃখজনক।’
শুধু বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল নয়, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী ও ভোলা জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতেও মিলছে না জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন।
বরিশাল সদর, বাকেরগঞ্জ, হিজলা, মুলাদী, মেহেন্দীগঞ্জ, উজিরপুর, বানারীপাড়া, বাবুগঞ্জ, গৌরনদী ও আগৈলঝাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা আক্রান্ত ব্যক্তিরা জানান, হাসপাতাল থেকে ভ্যাকসিন না পেয়ে বাইরের ফার্মেসি ঘুরে ঘুরে তা সংগ্রহ করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পাঁচ থেকে ছয়জন মিলে টাকা জোগাড় করে একটি ভ্যাকসিন কিনতে হয়েছে।
এ বিষয়ে বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিড়াল পোষার প্রবণতা বাড়ায় আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়েছে। সম্প্রতি ঝালকাঠিতে ভ্যাকসিন না নেয়ায় জলাতঙ্কে একজনের মৃত্যুর ঘটনায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে দৈনিক ৩০০ জনের বেশি মানুষ এলেও কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে ভ্যাকসিন সরবরাহ নেই।’










