বিদ্যমান আয়কর আইনে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে বিনিয়োগ কিংবা অনুদান দেয়ার ক্ষেত্রে করছাড় পাওয়ার সুবিধা রয়েছে। তুলনামূলক কম আয়ের করদাতারা এক্ষেত্রে বেশি সুবিধা পান। অন্যদিকে বেশি আয়ের করদাতাদের ক্ষেত্রে সুবিধা রয়েছে কিছুটা কম। তবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করছাড়ের এ সুবিধা কম বা বেশি আয়ের ব্যক্তি সবার জন্যই সমান করা হয়েছে। এতে ছোটদের তুলনায় বড়রা বেশি সুবিধা পাবেন।

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র, তালিকাভুক্ত শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ, ডিপোজিট পেনশন স্কিম (ডিপিএস), জীবন বীমা প্রিমিয়াম, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে অনুদান, নিয়োগকারী ও কর্মী কর্তৃক স্বীকৃত প্রভিডেন্ট ফান্ডে অর্থ প্রদান, কল্যাণমূলক ও গ্রুপবীমা তহবিলে অনুদান, সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ এবং বার্ধক্য তহবিলে অনুদান প্রদানের ক্ষেত্রে করছাড়ের সুবিধা দেয়া হয়েছে।

এছাড়া জাতির জনকের স্মৃতির উদ্দেশে নিবেদিত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান, জাকাত তহবিল, এনবিআর অনুমোদিত দাতব্য হাসপাতাল, প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে স্থাপিত প্রতিষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, আগা খান উন্নয়ন সংস্থা, আহছানিয়া ক্যান্সার হাসপাতাল, ঢাকা আহছানিয়া ক্যান্সার হাসপাতাল, এশিয়াটিক সোসাইটি, আইসিডিডিআরবি, পক্ষাঘাত পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি), স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে সংযুক্ত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান ও সরকার অনুমোদিত জনকল্যাণ কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুদান দিলেও করছাড় সুবিধা পাওয়া যাবে।

এসব খাতে যদি কেউ তার বার্ষিক আয়ের ২৫ শতাংশ অর্থ বিনিয়োগ বা অনুদান দেন, তাহলে তিনি করছাড় পাবেন। এক্ষেত্রে বার্ষিক আয় ১৫ লাখ টাকার কম হলে বিনিয়োগকৃত বা অনুদান দেয়া অর্থের ওপর ১৫ শতাংশ হারে করছাড় পাওয়া যাবে। যদি বার্ষিক আয় ১৫ লাখ টাকার বেশি হয়, সেক্ষেত্রে কর রেয়াতের হার হবে ১০ শতাংশ। মোট বার্ষিক আয় ১ কোটি টাকা পর্যন্ত এ করছাড় সুবিধা প্রযোজ্য হবে।

বিদ্যমান এ স্ল্যাবভিত্তিক কর রেয়াতের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম আয় করা জনগোষ্ঠী বেশি সুবিধা পেতেন এবং বেশি আয় করা জনগোষ্ঠী কিছুটা কম সুবিধা পেতেন। কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট বার্ষিক আয়ের ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ ও অনুদানের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ কর রেয়াত দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে আগের মতো স্ল্যাবভিত্তিক সুবিধা রহিত করা হয়েছে এবং বিনিয়োগ ও অনুদানের সীমাও কিছুটা কমানো হয়েছে।

করছাড়ের বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী, ১০ লাখ টাকা বার্ষিক আয়ের একজন করদাতা তার মোট আয়ের ২৫ শতাংশ বা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা অনুদান বা বিনিয়োগ করলে করছাড় পাবেন ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা। মোট বিনিয়োগকৃত অর্থের ১৫ শতাংশ হিসেবে এ ছাড় পাবেন তিনি। অন্যদিকে বার্ষিক আয় ৫০ লাখ টাকা এমন একজন করদাতা বিদ্যমান নিয়মানুসারে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ বা অনুদান দিলে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা করছাড় পাবেন। এক্ষেত্রে বার্ষিক আয় ১৫ লাখ টাকার নিচে হওয়ার কারণে মোট আয়ের ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ করছাড় পেয়েছেন প্রথম করদাতা। দ্বিতীয় করদাতার মোট বার্ষিক আয় ১৫ লাখ টাকার বেশি হওয়ায় তিনি তার মোট আয়ের আড়াই শতাংশ করছাড় পেয়েছেন। অর্থাৎ বিদ্যমান নিয়মে তুলনামূলক কম আয় করা ব্যক্তি বিনিয়োগ কিংবা অনুদান দিলে বেশি করছাড় পান।

এদিকে করছাড়ের প্রস্তাবিত নতুন বিধান অনুযায়ী, ১০ লাখ টাকা বার্ষিক আয়ের একজন ব্যক্তি তার মোট আয়ের ২০ শতাংশ বা ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ বা অনুদান দিলে করছাড় পাবেন ৩০ হাজার টাকা, যা বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী ৭ হাজার ৫০০ টাকা বেশি। আর ৫০ লাখ টাকা বার্ষিক আয়ের করদাতা প্রস্তাবিত নিয়মানুসারে তার মোট আয়ের ২০ শতাংশ বা ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ বা অনুদান দিলে করছাড় পাবেন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বিদ্যমান বিধান অনুসারে তার এ ছাড়ের পরিমাণ ২৫ হাজার টাকা কম। করছাড়ের বিধানে এ পরিবর্তনের ফলে তুলনামূলক কম আয়ের করদাতারের করছাড় পাওয়ার পরিমাণ কমে যাবে ও বিপরীতে বড় করদাতাদের ছাড়ের পরিমাণ বাড়বে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (আইসিএবি) মো. শাহাদাত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, সরকার নানা দিক চিন্তা করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেসব খাতে বিনিয়োগ করলে করছাড় সুবিধা পাওয়া যায় তার মধ্যে সঞ্চয়পত্রে বেশি বিনিয়োগ হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সরকার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কিছুটা নিরুৎসাহিত করতে করছাড়ের বিধানে এ পরিবর্তন এনেছে বলে মনে হয়। কারণ প্রতি বছর সরকারকে সঞ্চয়পত্রের সুদ পরিশোধ বাবদ বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয়। এ পরিবর্তনের ফলে যারা করছাড় সুবিধা পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগ করতেন তারা কিছুটা নিরুৎসাহিত হবেন।

সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি ডিপিএস, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও পুঁজিবাজারেও অনেকেই করছাড়ের জন্য বিনিয়োগ করে থাকেন। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে করছাড়ের বিধানে ছোটদের তুলনায় বড়দের সুবিধা বেশি দেয়ার কারণে অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) প্রেসিডেন্ট মো. ছায়েদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আয়করে ছাড় পাওয়ার উদ্দেশ্যে যারা বিনিয়োগ করতেন, তারা এ সিদ্ধান্তের কারণে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন। ফলে তাদের বিনিয়োগের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কমে যাবে।

পেশায় আয়কর আইনজীবী মো. আব্দুল কাদের নাবিলের বিনিয়োগ রয়েছে পুঁজিবাজারে। করছাড় সুবিধা পেতে তিনি প্রতি বছরই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেন। তবে করছাড়ের বিদ্যমান বিধান পরিবর্তনের প্রস্তাবের ফলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে তার আগ্রহ কমেছে বলে জানিয়েছেন আব্দুল কাদের নাবিল। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, বাজেটে প্রস্তাবে করছাড়ের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, এতে কম টাকা বিনিয়োগ করে বেশি কর রেয়াত সুবিধা পাবেন উচ্চ আয়ের করদাতারা। অন্যদিকে স্বল্প আয়ের করদাতাদের কর রেয়াত কমে আসবে এবং তুলনামূলক বেশি কর দিতে হবে। এমনিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণে স্বল্প আয়ের মানুষদের সংসার খরচ চালানো ভীষণ কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় করমুক্ত আয়সীমা বছরে সর্বনিম্ন ৩ লাখ টাকাতেই অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেই সঙ্গে কর রেয়াত কমে যাওয়ায় স্বল্প আয়ের করদাতাদের উল্টো করের বোঝা আরো বাড়ানো হয়েছে।