এক বছর আগেও দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) তহবিল সংগ্রহের ব্যয় ছিল সাড়ে ৮ শতাংশ। পরিচালন ব্যয় যুক্ত হওয়ার পর এসব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত তহবিল ব্যয় দাঁড়াত সাড়ে ৯ শতাংশেরও বেশি। গত এক বছরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল ব্যয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে। চলতি বছরের জুলাই শেষে এসব প্রতিষ্ঠানের কস্ট অব ফান্ড বা তহবিল সংগ্রহের ব্যয় সাড়ে ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। সমন্বিত তহবিল ব্যয়ের হার নেমে এসেছে ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল ব্যয়ের বর্তমান হারকে ইতিহাসের সর্বনিম্ন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মেয়াদি আমানত, বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ ও সঞ্চয় প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তহবিল সংগ্রহ করে। দেশের ব্যাংকগুলো থেকে বিভিন্ন মেয়াদে আমানত ধার নেয়াও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তহবিল জোগানের বড় উৎস। করোনাসৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগে দেশের ব্যাংক আমানতের সুদহার ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে আসে। বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থবির হওয়ায় দেশের ব্যাংক খাতে তৈরি হয় ইতিহাসের সর্বোচ্চ তারল্য স্তূপ। অভূতপূর্ব এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েই তহবিল সংগ্রহের ব্যয় কমিয়ে এনেছে এনবিএফআইগুলো।

সাধারণত মেয়াদি আমানতের বিপরীতে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ৯-১০ শতাংশের বেশি সুদ দিত। প্রথম সারির পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের তহবিল সংগ্রহের প্রধান উৎসই ছিল ব্যাংক। এ অবস্থায় পরিচালন ব্যয়সহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত তহবিল ব্যয় পড়ে যেত ১০ শতাংশের বেশি। বেশি ব্যয়ে তহবিল সংগ্রহ করায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বেশি সুদ দাবি করত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদহার হতো ১৫ শতাংশেরও বেশি। তবে সম্প্রতি তহবিল ব্যয় কমে আসায় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণের সুদহারও কমিয়ে এনেছে। বর্তমানে প্রথম সারির আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ৮-৯ শতাংশ সুদেও গ্রাহকদের ঋণ দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

তহবিল ব্যয় কমে যাওয়ায় এনবিএফআইগুলোর পাশাপাশি গ্রাহকরাও উপকৃত হচ্ছে বলে মনে করেন আইপিডিসি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মমিনুল ইসলাম। বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান পদে থাকা এ শীর্ষ নির্বাহী বণিক বার্তাকে বলেন, ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদ ৯ শতাংশ বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো অপেক্ষাকৃত কম সুদে ব্যাংক থেকে আমানত পাচ্ছে। ২০২০ সালের আগের দুই বছর দেশের দুর্বল এনবিএফআইগুলোকে আমানত দেয়া থেকে ব্যাংকগুলো নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল। মুদ্রাবাজারে তারল্যের জোয়ার তৈরি হওয়ায় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এখন এ ধরনের বিধিনিষেধ নেই। চাইলেই গ্রাহকদের পাশাপাশি ব্যাংকের কাছ থেকেও কম সুদে আমানত পাওয়া যাচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল ব্যয় কমে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ সালের জুলাইয়ে দেশের এনবিএফআইগুলোর তহবিল সংগ্রহের গড় ব্যয় ছিল ৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ধারাবাহিকভাবে এ ব্যয় কমে চলতি বছরের জুলাইয়ে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। পরিচালন ব্যয়সহ ২০২০ সালের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত তহবিল ব্যয় ছিল ৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ। চলতি বছরের জুলাইয়ে এ হার নেমে এসেছে ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশে। অর্থাৎ এক বছর আগে ১০০ টাকার আমানত সংগ্রহ করতে এনবিএফআইয়ের ব্যয় হতো ৯ টাকা ৫৬ পয়সা। এখন ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করতে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় ৭ টাকা ৪৫ পয়সা খরচ হচ্ছে।

দেশের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো না থাকায় তহবিল ব্যয় কমার সুফল পুরোপুরি ঘরে তোলা যাচ্ছে না বলে মনে করেন লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা শাহরিয়ার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদহার কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারণ করে দিলেও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেটি উন্মুক্ত। ব্যাংকঋণের সুদহার কমার কিছু সুফল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও পেয়েছে। আমাদের কস্ট অব ফান্ড কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে দেড় বছর ধরে করোনাসৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না হওয়ায় কস্ট অব ফান্ড কমানোর সুফল পুরোপুরি আমরা পাইনি। তার পরও যতটুকু সুফল আমরা পেয়েছি, সেটি গ্রাহকদের সঙ্গে ভাগাভাগি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগে আমরা এসএমই খাতে ১৪-১৫ শতাংশ সুদে ঋণ দিতাম। এখন ১০-১১ শতাংশ সুদে এসএমই গ্রাহকদের ঋণ দিতে পারছি।

বর্তমানে দেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা ৩৪টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটি সরকারি, বাকি ৩০টি বেসরকারি খাতের। দেশব্যাপী ৫৮টি শাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালন করছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শাখার সংখ্যা ২৪৮। গ্রাহকদের ৪৩ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকার আমানত জমা আছে এনবিএফআইগুলোতে। আর প্রতিষ্ঠানগুলোও গ্রাহকদের মাঝে বিতরণ করেছে ৬৯ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। এ ঋণের মধ্যে ৮ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা খেলাপির খাতায় উঠেছে, যা বিতরণকৃত ঋণের ১৩ দশমিক ২৯ শতাংশ।

ব্যাংকের সুদহারের সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের সুদহারে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হওয়ায় সমস্যাও হয়েছে বলে জানান বিডি ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কায়সার হামিদ। তিনি বলেন, ব্যাংকঋণের সুদহার ৯ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের সুদহার ছিল ১০ শতাংশের অনেক বেশি। এ কারণে অনেক গ্রাহকই এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণ ব্যাংকে স্থানান্তর করেছে। ব্যাংকের টেকওভারের কারণে এনবিএফআইগুলো নিয়মিত গ্রাহক হারাচ্ছিল। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলোর কস্ট অব ফান্ড কমে আসায় ঋণের সুদহারও কমানো সম্ভব হয়েছে। এসএমই খাতের বিদ্যমান গ্রাহকদের পাশাপাশি নতুন গ্রাহকদেরও আমরা স্বল্প সুদে ঋণ দিতে পারছি।