দেশে নদী ভাঙনপ্রবণ জেলার মধ্যে কুড়িগ্রাম একটি। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে উজানের ঢল আর বৃষ্টিতে ভাঙন দেখা দেয় জেলার নয়টি উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদের তীরে। গত ছয় বছরে নদ-নদীর ভাঙনে সীমান্তবর্তী এ জেলায় ঘর হারিয়েছে অন্তত ১৫ হাজার পরিবার। এ বছরও পানি বাড়া-কমার সঙ্গে নদ-নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বিনয়াপাড়া এলাকার দুধকুমার নদে অববাহিকায় বাস করেন আবুল খাঁ। উজানের ঢল আর কয়েকদিনের বৃষ্টিতে নদের পানি বাড়ার সঙ্গে তার বাড়িও ভাঙনের কবলে পড়ে। জায়গা না পেয়ে ব্রহ্মপুত্রের তীরে চর পার্বতীপুরে ঘর সরিয়ে নেন। এক সপ্তাহ আগে ঘর সরানো শুরু করলেও ভিটায় ভাঙনের কবলে রয়েছে আরো একটি ঘর। সেটিও নৌকায় করে সরিয়ে নেয়ার কাজ করছেন তিনি।
৫৫ বছর বয়সী আবুল খাঁ জানান, ব্রহ্মপুত্রে কয়েকবার বাড়ি ভাঙার পর যাত্রাপুরের বানিয়াপাড়ায় জমি কিনে ঘর করেছিলেন তিনি। পাঁচ বছরের মাথায় ভাঙনের কবলে পড়ল সে বাড়িটিও। এখন সাত সদস্যের পরিবার, চারটি ঘর, গবাদিপশুসহ বাড়ির আসবাবপত্র সব সরিয়ে নিচ্ছেন। যে চরে বাড়ি সরিয়ে নিয়েছেন সেখানে কতদিন থাকতে পারবেন সেটাও জানা নেই তার।
একই এলাকার মাহবুল, আবুল হোসেন, মফিজল, শহীদসহ আরো কয়েকজন গত এক মাসে ভাঙনের মুখে সরিয়ে নিয়েছেন তাদের ঘরবাড়ি। কারো ভিটের অর্ধেক নদীতে গেলেও কারো পুরোটাই নদীগর্ভে।
জেলার সাড়ে চার শতাধিক চরে প্রতি বছর গড়ে দুই হাজার পরিবার নদীভাঙনে তাদের বসতি হারান। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০১৬-২২ সাল পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদের ভাঙনে ১৫ হাজার পরিবার তাদের বসতবাড়ি হারিয়েছে। এ বছর ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে সদর, উলিপুর, চিলমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় ৪৪৭টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়া রৌমারী উপজেলার সোনাপুরে শতাধিক পরিবার, রাজারহাটে তিস্তার ভাঙনে ৬৩টি এবং ফুলবাড়ি উপজেলায় ধরলা নদীর ভাঙনে ছয়টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। এসব পরিবার অন্যের জমিতে ও বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় অনেকেই পরিবার নিয়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন।
সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের বাসিন্দা শওকত আলী (৬০) ও ছলিমা বেগম (৫০) দম্পতি। ৩০ বছরের দাম্পত্য জীবনে তাদের বাড়ি ১০ বার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের শিকার হয়েছে। সম্প্রতি উজানের ঢলে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বেড়ে ভাঙন শুরু হলে আবারো বসতি হারান তারা। বর্তমানে ছয় সদস্যের পরিবার নিয়ে পাঁচগাছি ইউনিয়নের চর পার্বতীপুর গ্রামে আশ্রয় নিয়েছেন।
সরজমিন দেখা গেছে, সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চর ভগবতীপুর এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ঝুঁকিতে রয়েছে। উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের পূর্ব গোবিন্দপুর এলাকায় প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায় ভাঙন দেখা গেছে। গত ১৫ দিনে নদীভাঙনে ওই এলাকার প্রায় ২৫টি বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে। নদী ভাঙনের শিকার এসব পরিবারের কেউ অন্যের বাড়িতে, আবার কেউ আবাসন প্রকল্পের মাঠে আশ্রয় নিয়েছেন। ওই এলাকায় দুটি মসজিদ, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র সেতুটিও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন ঘর নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে তিস্তা নদীর ভাঙনরোধে মানববন্ধন করেছেন উপুজেলার বজরা ইউনিয়নের সাদুয়াদামার হাট বগলাকুড়া এলাকার বাসিন্দারা।
উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র চরের বাসিন্দা মতিয়ার রহমান জানান, চরের জীবন যাযাবরের মতো। তার ৬০ বছর বয়সে ছয়টি চরে বসতি স্থানান্তর করতে হয়েছে। শুধু তার একার বাড়ি নয়, একটি চরের শতাধিক পরিবার একইভাবে এক চর থেকে আরেক চরে বসতি গড়েছে। ব্রহ্মপুত্রে নতুন চর জেগে ওঠার পর চার-ছয় বছরের মধ্যে সেই চর ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। তখন বসতি ভেঙে নতুন জেগে ওঠা চরে চলে যেতে হয়। এভাবেই জীবনের ঘানি টানতে হচ্ছে তাদের।
পূর্ব গোবিন্দপুর গ্রামের ছলিমা বেগম বলেন, ‘নদীভাঙনে ফসলি জমি, বসতবাড়ি চলে গেলেও আমরা ক্ষতিপূরণ পায় না। এক সময় কয়েক বিঘা ফসলি জমি থাকলেও এখন বাড়ি করার মতো জায়গা নেই।’
রাজারহাট উপজেলার চর গতিয়াসাম এলাকার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘তিস্তার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে তীব্র ভাঙন শুরু হয়। দেখতে দেখতে প্রায় ২৫টি বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে।’
উলিপুরের বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবলু মিয়া জানান, এ বছর তার ইউনিয়নে চার শতাধিক পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারের প্রায় ৪২টি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দেয়। এর মধ্যে ২০টি পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের কাজ চলছে। আরো কয়েকটি স্থানে কাজ শুরু হবে।’










