দেশের পোশাকখাতের উত্থান চট্টগ্রামের হাত ধরে হলেও রানা প্লাজা এবং তাজরীন ফ্যাশন বিপর্যয়ের পর অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কমপ্লায়েন্সগত ইস্যুতে টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যায় বিভাগের অর্ধেকের বেশি কারখানা। অন্যদিকে চট্টগ্রাম নগরীতে জমির সংকট ও দামের ঊর্ধমুখীতা এবং নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে না ওঠায় চট্টগ্রামের পোশাক শিল্পখাতটির অবস্থা এখন সংকটাপন্ন। তবে বঙ্গবন্ধু টানেলকে ঘিরে পোশাক শিল্প নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন এই খাতের উদ্যেক্তারা। নগরীর সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, জমির কম দাম এবং শ্রমঘন এলাকা হওয়ায় কর্ণফুলী নদীর ওপর গড়ে উঠছে একের পর পোশাক কারখানা।


উদ্যোক্তা এবং খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্ণফুলী নদীর ওপারে অর্থাৎ দক্ষিণ চট্টগ্রামে জমির দাম কম থাকায় কারখানা স্থাপনে পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের আগ্রহ ছিল সেদিকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু টানেল ঘিরে যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যপক উন্নতি হওয়ায় ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বাড়ছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং পানির সংকট সমাধান করা গেলে এটি হয়ে উঠতে পারে নারায়ণগঞ্জ কিংবা গাজীপুরের মতো পোশাকখাতের বড় শিল্প এলাকা।


বিজিএমইএর তথ্যমতে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে জমি, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নগরীর বাইরে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছেন কারখানা মালিকরা, যাদের বেশিরভাগই দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায়। এর মধ্যে অন্যতম কর্ণফুলীর খোয়াজনগরে হ্যারডস গার্মেন্টস, জিএসএল এক্সপোর্ট, বেলামি টেক্সটাইল, এটিপি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এবং বেঞ্চমার্ক অ্যাপারেল। বোয়ালখালীতে রিজেন্ট টেক্সটাইল (সাময়িক বন্ধ), ফিগো ফ্যাশন, পটিয়াতে ওশান স্টেট লিমিটেড, আরেফিন টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, সিজারস অ্যাপারেল, সান ফ্যাশন লিমিটেড, বডিস অ্যাপারেলস লিমিটেড, শাহ আমানত ফেব্রিকস অন্যতম। তবে টানেলের কারণে নগরীর সঙ্গে দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগ বাড়ার সম্ভবনার কারণে আরো অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠান সেখানে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে বলে জানা গিয়েছে।


বিজেএমইএ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী চট্টগ্রামে সংগঠনটির নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা ৬১৭টি। এর মধ্যে চালু আছে ৩৩০টি। বন্ধ হয়ে গিয়েছে ২৮৭টি প্রতিষ্ঠান। চালু থাকা ৩৩০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৫০টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি আমদানি ও রফতানির সঙ্গে জড়িত আছে। ১৩০টি প্রতিষ্ঠান সাব-ঠিকাদার হিসেবে বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। তবে ২০১৬ সালে বিজিএমইএর নিবন্ধিত কারখানা ছিল ৬৯৪টি। এমনকি ২০১৮ সালে চট্টগ্রামে কারখানা চালু ছিল ৩৬৫টি।

 

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বিজিএমইএর তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ৩০ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে রফতানি হয়েছে ৩ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যা দেশের মোট রফতানির ১৩.৩৮ শতাংশ। এছাড়া ২০১৮-১৯ এ ৩৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার, ১৯-২০ অর্থবছরে ২৭ দশমিক ৯৪, ২০-২১ অর্থবছরে ৩১ দশমিক ৪৫, ২১-২২ অর্থবছরে রেকর্ড  ৪২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে পোশাক খাতে ৪৬ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে সর্বশেষ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার রফতানি করা সম্ভব হয়েছে।


অথচ পরিসংখ্যান বলছে ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে পোশাক খাতে জাতীয় রফতানির পরিমাণ ছিল ১৫০ কোটি ডলার। এর মধ্যে চট্টগ্রামের অবদান ৫০ কোটি ডলার, যা ছিল মোট পোশাক রফতানির ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ বর্তমান বাজারে চট্টগ্রামের অবস্থান ক্রমশ নিম্নমুখী। তবে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের দাবি চট্টগ্রামের পোশাক কারখানা কমলেও এখনো প্রতি বছর জাতীয় রফতানির ১৫ শতাংশ চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয়ে থাকে। তবে টানেল এবং মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ শেষ হলে চট্টগ্রামের পোশাক কারখানা আগের অবস্থানে ফিরে আসবে বলে মনে করেন তারা।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বণিক বার্তাকে বলেন, টানেল দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা এবং কক্সবাজারের জন্য ব্যবসায়িক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। চট্টগ্রাম মহানগরী ছোট এবং জনসংখ্যার চাপ বেশি থাকায় জমি কিনে পোশাক কারখানা স্থাপন করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। সেজন্য ব্যবসায়ীরা কর্ণফুলী নদীর ওপারে বোয়ালখালী, কর্ণফুলী, পটিয়া, চন্দনাইশ এসব উপজেলায় কারখানা স্থাপন করছেন। কারণ এসব এলাকায় কম দামে জমি পাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এ এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট রয়েছে। আমি নিজেও গ্যাস সংকটের কারণে কারখানা চালু করতে পারিনি। টানেল চালু হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে কিন্তু শিল্প কারখানার জন্য সরকারকে লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তাহলে এই এলাকা আগামীর চট্টগ্রামের জন্য বড় একটি শিল্প এলাকায় পরিণত হবে বলে মনে করেন তিনি।


পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে জায়গার মূল্য অনেক বেশি। তাছাড়া এখানে কারখানাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। নগরীর মধ্যে নতুন জায়গার সংকট প্রবল। তাছাড়া রানা প্লাজা ও তাজরীন ফ্যাশন বিপর্যয়ের পর অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের কমপ্লায়েন্সগত ইস্যুতে টিকতে না পেরে চট্টগ্রামের অর্ধেকের বেশি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি সরাসরি রফতানি করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমে গিয়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অনেক প্রতিষ্ঠান সাব কন্ট্রাক্টে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। দেশের পোশাক শিল্পের সূচনা যে চট্টগ্রামে, সেখানেই কোনো গার্মেন্টস পল্লী গড়ে ওঠেনি। তবে টানেলের কারণে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পোশাকখাতের সম্ভাবনা দেখা দিলেও এ এলাকায় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট আছে।


এদিকে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ছাড়াও চট্টগ্রামে তৈরি পোশাকখাতের আরেকটি সম্ভাবনাময় শিল্পজোন হিসেবে মনে করা হচ্ছে উত্তর চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে। বিজিএমইএর সর্বশেষ তথ্যমতে, অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে পোশাকখাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০০ একর জমি। এর মধ্যে ৩২১ একর জমি বিভিন্ন কারখানার মধ্যে বরাদ্দ দিয়েছে বেজা কর্তৃপক্ষ। ঢাকার ৪৩টি এবং চট্টগ্রামের মালিকানাধীন ১৬টি প্রতিষ্ঠান জমি বরাদ্দ বুঝে পেয়েছে। তবে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ শ্লথগতিতে এগোতে থাকায় এ অঞ্চল থেকে পোশাকখাতের সুফল পেতে বেশকিছুটা সময় লাগবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।


বিজিএমইএর প্রথম সভাপতি এবং ওয়েল ডিজাইন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল চট্টগ্রামের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। শুধু দক্ষিণ চট্টগ্রাম নয়, কক্সবাজার অঞ্চলের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতার চাবিকাঠি হয়ে উঠবে এ টানেল। টানেলকে ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামে বড় বড় শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে। সেখানে পোশাক কারখানার সংখ্যা বাড়ছে, টানেল চালু হলে এ সংখ্যা আরো বাড়বে। মূলত চট্টগ্রাম ছোট এলাকা হওয়ায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী ও গাজীপুরের মতো বৃহৎ শিল্প জোন গড়ে উঠতে পারেনি। টানেল এবং মিরসরাই ইকোনমিক জোনের কারণে আমরা চট্টগ্রামের পোশাক কারখানার ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখছি। তবে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট সমাধানসহ চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের কার্গো সার্ভিস চালু করা জরুরি।

বিজিএমইএ নেতা আরো বলেন, টানেলের সুফল পেতে হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের দিকে সরকারের নজর দিতে হবে। কারণ, চার লেনের সড়ক দিয়ে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম পোর্ট এবং টানেলের সুফল এত সহজে পাওয়া যাবে না। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বাণিজ্যের প্রধান শক্তি। সেজন্য আমদানি রফতানির বেশিরভাগই নির্ভর করে এ মহাসড়কের ওপর। সেজন্য টানেল এবং এ অঞ্চলের ব্যবসার উন্নয়নে মহাসড়ক বর্ধিতকরণ, বিমানবন্দর আধুনিকরণ এবং আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।