দেশের খুচরা বাজারে ২০১৭ সালে গড়ে প্রতি কেজি ইলিশের মূল্য ছিল ৭৪৯ টাকা। পাঁচ বছর পর এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪৫ টাকায়। দাম বেড়েছে চিংড়ি, পাঙাশ, তেলাপিয়াসহ প্রায় সব মাছেরই। তবে ব্যতিক্রম কেবল রুই ও কাতলায়। বছর পাঁচেক আগে মাছ দুটির কেজি ছিল গড়ে ৩৩২ ও ৩২২ টাকা, এখন সেগুলো বিক্রি হচ্ছে যথাক্রমে ২৯৭ ও ২৮০ টাকায়। সেই হিসেবে গত পাঁচ বছরে রুই ও কাতলার দাম কমেছে। অর্থাৎ সময়ের ব্যবধানে এগুলোর বাজার হেঁটেছে মূল্যস্ফীতির উল্টো পথে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন বৃদ্ধি ও তৈরি খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা কম থাকায় রুই ও কাতলা মাছের দরে তেমন প্রভাব ফেলেনি বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। আবার ভারত ও মিয়ানমার থেকে তুলনামূলক কমে আমদানি হওয়ায় মাছ দুটির দাম বাড়েনি। দেশের সবচেয়ে বেশি রুই ও কাতলা উৎপাদন হয় পাবনায়। ওই জেলার ভাঙ্গুড়া উপজেলার মত্স্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. আলী আজম বণিক বার্তাকে বলেন, কাতলা মাছ সাধারণত ওপরের স্তরের খাবার খায়। তৈরীকৃত খাবারও খায়, তবে তেলাপিয়া-পাঙাশের চেয়ে কম। ফলে খাবারের দামের প্রভাব তুলনামূলক রুই-কাতলায় কম পড়ছে।
দেশের বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মূল্যের মাসভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণ করে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেয়া পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালে খুচরা পর্যায়ে মাঝারি আকারের (দেড় থেকে দুই কেজি) রুই মাছ বিক্রি হয়েছে ৩৩২ টাকা কেজিতে। এর পরের বছরগুলোর মধ্যে ২০১৮ সালে ৩০০ টাকা, ২০১৯ সালে ৩১০, ২০২০ সালে ৩০০ ও ২০২১ সালে ২৯৭ টাকা কেজি ছিল। আর চলতি আগস্টে প্রতি কেজি রুই মাছের দাম দেখানো হয়েছে ৩০৯ টাকা। এছাড়া মাঝারি আকারের কাতলা মাছের দাম প্রতি কেজি ২০১৭ সালে ৩২২ টাকা, ২০১৮ সালে ৩০২, ২০১৯ সালে ৩১১, ২০২০ সালে ২৯২ ও ২০২১ সালে ২৭৬ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে ওয়েবসাইটে। চলতি আগস্টে কাতলা মাছের দাম দেখানো হয়েছে প্রতি কেজি ২৮৬ টাকা। অন্যদিকে তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছ গত পাঁচ বছরে কেজিতে বেড়েছে প্রায় ৫০-৫৫ টাকা।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেয়া মাছের মূল্যের সঙ্গে অবশ্য রাজধানীর খুচরা ও পাইকারি বাজারের মূল্যের কিছুটা তফাত রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে গত দু-এক মাস ধরে মাঝারি আকৃতির রুই মাছের কেজি ৩২০-৩৫০ টাকা। একই আকৃতির কাতলা বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৩২০ টাকায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা তো শুধু ঢাকার কোনো নির্দিষ্ট বাজারের তথ্যের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান তৈরি করি না। সারা দেশের তথ্য সংগ্রহ করে তার গড় তথ্যটাই প্রকাশ করা হয়। এজন্য ঢাকার কোনো খুচরা বাজারের সঙ্গে তুলনা করলে মনে হবে আমাদের তথ্যে কম দেয়া হয়েছে। আবার ঢাকার বাইরের অনেক বাজারের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে দাম বেশি।
মত্স্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে মাছের খাবারের দাম বেড়েছে ৫০-৮০ শতাংশ। এছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বেড়েছে পরিবহন খরচ। এর প্রভাব পড়ছে মাছের বাজারেও। তাই নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা প্রোটিনের অভাব পূরণ করতে তেলাপিয়া ও পাঙাশকেই বেছে নিচ্ছেন। এতে চাহিদা বাড়ায় দামটাও বেড়ে গেছে। বছরের শুরুতে ১২০-১৫০ টাকার মধ্যে মাছ দুটির কেজি থাকলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকায়।
ফিশ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সভাপতি মোল্লা শামসুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, আগে যে খাবার প্রতি কেজি ৪০ টাকা ছিল, সেটা এখন ৭০ টাকা। আবার পরিবহন খরচও বেড়েছে। ফলে সার্বিকভাবে মাছের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে দেশে আমদানি হওয়া রুই-কাতলার দাম দেশে চাষ হওয়া রুই-কাতলার চেয়ে কম। ফলে অন্যগুলোর তুলনায় এ দুই প্রজাতির মাছের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল। কুমিল্লার মত্স্যখামারি আলী আহমেদ মিয়াজী বণিক বার্তাকে বলেন, দুই কেজির একটি রুই মাছ আমরা পাইকারি ৩০০-৩২০ টাকায় বিক্রি করি। আবার এক কেজিরটা ২৪০-২৫০ টাকা। কাতলা মাছও প্রায় একই দাম। আমরা আগেও প্রায় একই দামে বিক্রি করতাম। এখন সামান্য একটু বেশি।
রুই ও কাতলা মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিকেও দামের স্থিতিশীলতার কারণ বলে মনে করেন অনেকেই। মত্স্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রুই মাছের মোট উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৬২৭ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ১৪৩ টন। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে কাতল মাছের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার ১৯১ টন। সেটা ২০২০-২১ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫৫ টন।
অন্য মাছের তুলনায় রুই-কাতলার সরবরাহ পর্যাপ্ত জানিয়ে কারওয়ান বাজারের মাছের আড়তদার মো. হাবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছ কেজিতে বেড়েছে ৪০-৬০ টাকা। তবে রুই-কাতলার ক্ষেত্রে দাম ওঠানামা করলেও এতটা বাড়েনি। আর তেলাপিয়া-পাঙাশ তো নিম্ন মধ্যবিত্তরাই বেশি কেনেন। কিন্তু বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়া সবাই কম দামের এ মাছ দুটির দিকে ঝুঁকছেন। ফলে চাহিদা বাড়ায় দামটাও বেড়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিপণন বিভাগের অধ্যাপক ড. জিএম মনিরুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, তেলাপিয়া ও পাঙ্গাশের চাহিদা ভোক্তা পর্যায়ে বেশি। ফলে নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তদের চাহিদা অনুযায়ী এর দাম বেড়ে যায়। কারণ এর কোনো বিকল্প নেই। তবে রুই-কাতলার দাম যদি হুট করে বাড়িয়ে দেয়া হয়, তখন এর ক্রেতারা অন্য মাছ খাবে। কারণ এসব মাছের বিকল্প আছে। আর এসব মাছ সাধারণত যাদের আয় ভালো তারাই খান। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, তেলাপিয়া ও পাঙাশে খাদ্য একটু বেশি লাগে। খাদ্যের দামের প্রভাব মাছের ওপরও পড়ে। সে তুলনায় রুই-কাতলার খাদ্য কম লাগে। মাছ দুটি আমদানিও হয়। ফলে দেশে চাষ হওয়া মাছের দাম বেশি হলে তখন মানুষ আমদানি হওয়া রুই-কাতলার দিকে ঝুঁকবে। তাই মাছ দুটির দাম কখনই অস্বাভাবিক বাড়ে না।










