চব্বিশের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বা ‘জেন জি’ বিপ্লবের পর এটিই বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন। ফলে এবারের নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর বেশ আগ্রহ লক্ষ করা গেছে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন ও গণভোট পর্যবেক্ষণে ঢাকায় এসেছেন ১৯৭ জন বিদেশী সাংবাদিক। বিশ্বের বিশিষ্ট গণমাধ্যমগুলো নির্বাচন নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করছে। এর মধ্যে আছে রয়টার্স, বিবিসি, দ্য গার্ডিয়ান, আল জাজিরা, দ্য নিউইয়র্ক টাইমসসহ বেশ কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সে গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘একটি উৎসব: ঐতিহাসিক নির্বাচনে বিপুল ভোটারের অংশগ্রহণ’। এ প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃহস্পতিবার ভোট দিতে ভোট কেন্দ্রগুলোয় ভিড় করছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। সবার আশা, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে।

বিকাল সাড়ে ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষ হলে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমটি। ‘ভোট গ্রহণ শেষ, শুরু হয়েছে গণনা’ শিরোনামের এ খবরে বলা হয়, দিনভর কয়েক কোটি ভোটারের ভোট গ্রহণ শেষে এখন চলছে গণনা। ‘জেনারেশন জেড’ বা জেন জি প্রজন্মের হাত ধরে আসা এক গণ-আন্দোলনের পর দেশে নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, এটি বিশ্বের প্রথম নির্বাচন, যা অনূর্ধ্ব-৩০ বা ‘জেন জি’ প্রজন্মের নেতৃত্বে হওয়া এক গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সংবাদ সংস্থাটি গতকাল লাইভ ভোট গণনাসহ ফটোস্টোরির মাধ্যমে ঢাকার ভোট গণনা পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির ‘গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচন: ভোটগ্রহণ শুরু’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কারের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেবেন ভোটাররা।

আরেক প্রতিবেদনের শিরোনাম—‘ভোট গ্রহণ শেষ: জেন-জি অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে চলছে গণনা’। খবরে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে; এখন চলছে গণনা। সংসদের ৩০০ (ভোট হয়েছে ২৯৯ আসনে) আসনের জন্য লড়ছেন দুই হাজারের বেশি প্রার্থী। তবে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ থাকায় এ নির্বাচনে তাদের কোনো প্রার্থী নেই।

সংবাদমাধ্যমটি ভোট চলাকালীন লাইভ সম্প্রচারও করেছে। সেখানে ১২ কোটিরও বেশি মানুষ এবারের নির্বাচনে ভোট দিচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, এবার নির্বাচনে মূল অংশগ্রহণকারী দল—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বেশ কঠোর ছিল বলেও উল্লেখ করেছে বিবিসি।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেও ২০২৬-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন লাইভ সম্প্রচার করেছে। শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ: ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর ভোটাররা যাচ্ছেন ভোট দিতে’।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ‘গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছে কাতারভিত্তিক আল জাজিরা। সংবাদমাধ্যমটির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এ নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদল নয়, বরং এটি একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের সূচনা। বিশেষ করে নির্বাচনে জেন জিদের ভূমিকা তুলে ধরে জানানো হয়েছে, প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ তরুণ ভোটার এবারের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবেন। এছাড়া আল জাজিরার লাইভ আপডেটে দেখা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ড্রোন ও ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চালানো হচ্ছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন বলে উল্লেখ করেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানও। সংবাদমাধ্যমটি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর আলোকপাত করেছে। পত্রিকাটির মতে, তারেক রহমান ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি ও অপরাজনীতির বিরুদ্ধে ‘নো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে তরুণ ভোটারদের তথা জেন-জি প্রজন্মের ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রায় ৫০ লাখ তরুণ প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছে, যারা ২০২৪-এর আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে প্রায় ৫০০ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এ বিশাল কর্মযজ্ঞ পর্যবেক্ষণ করেছেন বলে এপি জানিয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসও বাংলাদেশের তরুণ নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেছে।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ডন নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচার ও ভুয়া তথ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পত্রিকাটির মতে, ভোটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার নামে মিথ্যা তথ্য ও ছবি ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা লক্ষ করা গেছে।

ভারতের গণমাধ্যম এনডিটিভি বাংলাদেশের নির্বাচনকে ‘নতুন এক রাষ্ট্রের জন্ম’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের প্রতিবেদনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মন্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ১৯৭১ সালের পর এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি বড় বাঁক। ২০২৪ সালের জেন জি প্রজন্মের গণ-অভ্যুত্থানের পর এটিই প্রথম ভোট, যেখানে মানুষ ‘দুঃস্বপ্ন’ কাটিয়ে নতুন স্বপ্নের পথে যাত্রা শুরু করেছে। প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের বরাতে বাংলাদেশের নির্বাচনকে ‘শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার অটুট রয়েছে। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি দায়বদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের ‘অভূতপূর্ব যাত্রা’ শুরু হলো। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনী ও গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি ড. ইউনূসের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিষয়টিও তুলে ধরেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।