বিশ্বের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর ছাপ ফেলতে শুরু করেছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। রেশ এসে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। রাশিয়া-ইউক্রেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তৈরি পোশাক রফতানি কমে গেছে, বন্ধ রয়েছে অনেক দেশের সঙ্গে ব্যাংক লেনদেন, বেড়ে গেছে জাহাজ ভাড়া। এর ফলে ব্যবসায় যে ক্ষতি হয়েছে, তার কারণ দেখিয়ে দেশের অন্তত ৯৩টি গার্মেন্টস ফেব্রুয়ারির বেতন-ভাতা মার্চেও পরিশোধ করতে পারবে না বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। গত ৩১ মার্চ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের দেয়া এক প্রতিবেদনে এ কথা উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রফতানি কমে যাওয়া, ক্রয়াদেশ বাতিল, কাজের অর্ডার কমে যাওয়া বা একেবারে না পাওয়া, মূলধন স্বল্পতা, ঋণ ও প্রণোদনা না পাওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে প্রতি মাসে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে না কিছু গার্মেন্টস। এর মধ্যে যুদ্ধের প্রভাব সংকট আরো বাড়াবে। এর জের ধরে যেকোনো সময় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় তৈরি পোশাক শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। তবে কিছু গার্মেন্টস মালিক নানা অজুহাতে প্রতি মাসে সময়মতো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেন না। অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ পূর্ব নোটিস ছাড়াই কারখানা বন্ধ করে দেয়। এছাড়া সুনির্দিষ্ট নিয়ম না মেনে বিভিন্ন সময়ে কারণে-অকারণে শ্রমিক ছাঁটাই, ওভারটাইম ভাতা ও বার্ষিক ছুটির টাকা না দেয়া, কারখানায় পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী না থাকা, হঠাৎ করে গার্মেন্টস কারখানা অন্যত্র সরিয়ে ফেলা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবসহ বিভিন্ন ইস্যুতে মাঝেমধ্যেই গার্মেন্টস শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ঢাকা মহানগরী, সাভার-আশুলিয়া, টঙ্গী-গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে মোট ৪ হাজার ৩৪৭টি গার্মেন্টসের মধ্যে ৯৩টির শ্রমিকদের গত ফেব্রুয়ারির বেতন-ভাতা মার্চের মধ্যেও পরিশোধ করার সম্ভাবনা নেই বলে জানা গেছে। ফলে এ ৯৩টি গার্মেন্টসে যেকোনো সময় শ্রম অসন্তোষ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী গার্মেন্টস ফ্যাব্রিকসসহ অন্যান্য সরঞ্জামের আমদানি সংকট, কাজের অর্ডার কম বা না পাওয়া কিংবা অর্ডার বাতিল হওয়া ইত্যাদি কারণে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও সাব-কন্ট্রাক্টের গার্মেন্টসগুলোর উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় কিছু গার্মেন্টস মালিক সময়মতো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে থাকেন। বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়ে শ্রমিকরা যেন তাদের বেতন-বোনাস ও অন্যান্য ভাতা সঠিকভাবে ও সময়মতো পান, সে বিষয়টির প্রতি নজরদারি প্রয়োজন। এছাড়া কারখানা অন্যত্র সরিয়ে নিলে বিষয়টি শ্রমিকদের আগেই জানিয়ে বেতন-বোনাস ও অন্যান্য ভাতা পরিশোধ করে স্থানান্তর করতে হবে। মালিকরা যদি কোনো কারখানা বন্ধ করে কিংবা শ্রমিক ছাঁটাই করেন, তাহলে সেটা যেন শ্রম আইন অনুযায়ী হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া না হলে চিহ্নিত ৯৩টি গার্মেন্টসে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া যুদ্ধের কারণে অনেক গার্মেন্টসের বিদেশে ব্যাংক লেনদেন বন্ধ থাকাসহ জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় রাশিয়া ও ইউক্রেনসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশে গার্মেন্টপণ্য রফতানি কমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে গার্মেন্ট পণ্য রফতানি স্বাভাবিক রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে এ খাতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে বেশকিছু সুপারিশও করা হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে। সেগুলো হচ্ছে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়ম অনুযায়ী যেন প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করা হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশী অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রে অসুস্থ প্রতিযোগিতা পরিহারে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধ রোধে রুগ্ণ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র কারখানাগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের সমস্যা সমাধানে আর্থিক ও কারিগরি প্রণোদনাসহ সমস্যা সমাধানে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে।
এছাড়া বাজার গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ ও পণ্যের বহুমুখীকরণসহ বাজার সৃষ্টিতে উদ্যোগী হওয়ারও পরামর্শ দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইউরোপে গার্মেন্ট পণ্য রফতানি স্বাভাবিক রাখতে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। শ্রমিক বিক্ষোভ ও অসন্তোষ রোধে হঠাৎ করে শ্রমিক ছাঁটাই ও কারখানা বন্ধ না করে শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানা লে-অফ ও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া শ্রমিক অসন্তোষসহ যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার আগাম তথ্য পাওয়া গেলে তা আগেই প্রশাসন, মালিক-শ্রমিক নেতাদের সমন্বয়ে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রতিবেদনে শ্রমিক অসন্তোষের ঝুঁকিতে থাকা যে গার্মেন্টস কারখানাগুলোর নাম উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে রাজধানীর দক্ষিণখানের ইন্ট্রাকো ফ্যাশন লিমিটেড, পল্লবীর অ্যাডামস প্রাইভেট গার্মেন্টস লিমিটেড, রূপনগরের যমুনা ফ্যাশন লিমিটেড, কে টেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সাভারের রাকিব অ্যাপারেলস লিমিটেড, আশুলিয়ার জিরাব এলাকার ম্যাগপাই নিটওয়্যার লিমিটেড, গাজীপুরের এএসআর সোয়েটার লিমিটেড, লাক্সমা ইনার ওয়্যার লিমিটেড, জিম অ্যান্ড জেসি কম্পোজিট, ডেল্টা নিট কম্পোজিট লিমিটেড, টিআরজেড গার্মেন্টস লিমিটেড, স্টাইল ক্রাফট লিমিটেড, ইয়াং ওয়ান্স (বিডি) লিমিটেড, ইস্ট ওয়েস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেড, চট্টগ্রামের সাদ-মুছা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ব লিমিটেড, রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, নারায়ণগঞ্জের বেকা গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল লিমিটেড ও ময়মনসিংহের সাবাব ফ্যাব্রিকস লিমিটেড, দ্য রোজ গার্মেন্টস ডিজাইনার ইউনিট লিমিটেড, ওরিয়ন নিট টেক্স লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠান।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা এ বিষয়গুলো নিয়মিত দেখভাল করছি। যেসব কারখানার অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে বা আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক থেকে ঋণের পাশাপাশি বিজিএমইএর পক্ষ থেকেও সহযোগিতা করা হয়। কিন্তু পুলিশের এ প্রতিবেদনটি এখনো আমরা হাতে পাইনি। পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
একইভাবে প্রতিবেদন হাতে পেলে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।










