পিপলস রিপাবলিক অব চায়না। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র। ইরান, ভারত ইনকা, মায়ার মতো প্রাচীন চীনের সভ্যতা। ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বিপ্লবের পর এক নতুন চীনের যাত্রা হয়। নানা রকম সংস্কার ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান বিশ্বে চীন অন্যতম এক পরাশক্তি। জিডিপির হিসাবে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফসল নয়া চীন এখন পুঁজিবাদী বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র। ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে চীনের শক্তি-দুর্বলতা, সাফল্য-ব্যর্থতা ও ধারাবাহিক পরিবর্তনগুলো নিয়ে লিখেছেন আনু মুহাম্মদ

৪ মে আন্দোলন

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব বিশ্বের অন্য অঞ্চলগুলোর মতো চীনকেও নানাভাবে প্রভাবিত করেছিল। তরুণদের চিন্তা ও সংগঠনে এর প্রভাব পড়ে প্রথম। ১৯১৯ সালের মে মাসে প্রধানত শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে চীনের বিভিন্ন শহরে যে আন্দোলন সংঘটিত হয়, তার উদ্যোক্তা হিসেবে এ তরুণদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এটি ‘৪ মে আন্দোলন’ নামে পরে পরিচিতি পায় কেননা এদিনই আন্দোলন বিস্তৃত হয়েছিল। এ আন্দোলন প্রাথমিকভাবে গড়ে উঠেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ‘ভার্সাই চুক্তি’ নিয়ে চীন সরকারের দুর্বল অবস্থানের প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে। চীন এ বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল ‘মিত্রশক্তি’র পক্ষে এ শর্তে যে, জার্মানি চীনের যে অঞ্চল আগে থেকে দখল করে রেখেছিল তা চীনকে ফেরত দেয়া হবে। উল্লেখ্য, এ যুদ্ধে চীনের প্রায় দেড় লাখ সৈনিক ও শ্রমিক ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অংশ হিসেবে কাজ করে।

কিন্তু ১৯১৯ সালের এপ্রিলে তৈরি ‘ভার্সাই চুক্তিনামা’য় চীনের শর্ত রক্ষা করা হয়নি। বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানির নিয়ন্ত্রণ থেকে চীনের শানডং এলাকা মুক্ত হয়, কিন্তু এর ওপর জাপানের দখলের বৈধতা দেয়া হয়। সরকারও এর বিরুদ্ধে কোনো দৃঢ় অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়। জনগণের ক্ষোভ দ্রুত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের রূপ নেয়। চীনের ভূখণ্ড, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্যমান ক্ষোভই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় চেতনার নতুন সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। যে কারণে একে নয়া সংস্কৃতি আন্দোলনও বলা হয়। এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের অনেকেই পরবর্তী সময়ের বিপ্লবী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ভার্সাই চুক্তি নিয়ে আলোচনার সময় চীনা সরকার অংশীদার অন্যান্য দেশের কাছে তিনটি আবেদন উপস্থিত করেছিল। এগুলো হলো: ১. চীনে সব বিদেশী শক্তির বিশেষ সুবিধার অবসান। ২. চীনের ওপর জাপানিদের দাবি প্রত্যাখ্যান। ৩. জার্মানির হাত থেকে মুক্ত চীনা অঞ্চল জাপানি দখলমুক্ত করা। ভার্সাই সভায় উপস্থিত বিজয়ী পশ্চিমা শক্তিগুলোর কাছে চীনের এসব দাবির কোনো গুরুত্বই ছিল না।    চীনকে উপেক্ষা করেই ১৯১৯ সালের ২৮ জুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়ে যায়।

 

যা-ই হোক চুক্তি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে মে মাসের ৪ তারিখ সকালে বেইজিংয়ের ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাঁচটি প্রস্তাব নিয়ে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি নিতে একমত হন। এ প্রস্তাবগুলো হলো: ১. চীনা ভূমির ওপর জাপানি নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান। ২. চীনের করুণ অসম্মানজনক পরিস্থিতি দেশের জনগণের কাছে তুলে ধরা। ৩ বেইজিংয়ে একটি বিশাল সমাবেশের ব্যাপারে জনমত তৈরি করা। ৪. বেইজিং স্টুডেন্ট ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা এবং ৫. বিকালে সম্মিলিত সমাবেশ করা।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এদিন বিকালে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিছিল করে এসে তিয়েনআনমেন স্কোয়ারে সমাবেশ করে। ‘মিত্রশক্তি’র বিশ্বাসঘাতকতা এবং সরকারের দুর্বল ভূমিকার সমালোচনার পাশাপাশি সমাবেশ থেকে জাপানি পণ্য বয়কট এবং ‘জাপানের দালাল’দের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। এ রকম এক সরকারি কর্মকর্তার বাড়িতে হামলার পর শিক্ষার্থীরা ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয়। অনেককে গ্রেফতার করা হয়। এর প্রতিবাদে পরের দিন বেইজিংয়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। তেরোটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলররা ছাত্রবন্দিদের মুক্ত করতে নানা উদ্যোগ নেন, পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান এ ছাত্র নির্যাতনের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। সংবাদপত্র, বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন, চেম্বার অব কমার্স শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেয় বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরাও। খবর ছড়িয়ে যায় অন্যান্য শহরে। জুনের প্রথম দিকে সাংহাইয়ের শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরাও আন্দোলনে যোগ দেয়। এ সময় থেকে আন্দোলনের কেন্দ্র কার্যত সাংহাইতে স্থানান্তরিত হয়।

এক পর্যায়ে ব্যবসায়ীরা সরকারের ভূমিকার পরিবর্তন না হলে খাজনা বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেয়। সাংহাইতে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের ধর্মঘট অর্থনীতিতে অচলাবস্থা তৈরি করে। ক্রমবিস্তৃত প্রতিরোধের মুখে সরকার আটক ছাত্রদের মুক্তি দেয় এবং অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করে। প্যারিসে চীন সরকারের প্রতিনিধিরা ভার্সাই চুক্তি সই করতে অস্বীকৃতি জানায়। যদিও জাপান চীনাভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, তবুও এ খণ্ড সাফল্য চীনের মানুষের বিভিন্ন অংশের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের শক্তি সম্পর্কে জানান দেয়। আন্দোলন সমাজের চিন্তার বিপ্লবীকরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে, যা কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

চিয়াং কাই শেক ৪ মে আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিলেন। ডা. সান ইয়াৎ সেনও ‘তরুণদের বিভ্রান্ত করার’ অভিযোগ তুলে এ সময়ের কোনো কোনো বুদ্ধিজীবীর সমালোচনা করেন। চীনের প্রাচীন মূল্যবোধ, সংস্কৃতির সঙ্গে পশ্চিমের সংস্কৃতির সম্পর্ক/বিরোধ নিয়ে সমাজে এক ধরনের উদ্বেগ ছিল তখন। তরুণদের প্রথা ভাঙার প্রবণতায় অনেকেই আতঙ্কিত হন। কিন্তু ২০ বছর পর ৪ মে আন্দোলন মূল্যায়ন করতে গিয়ে মাও জে দং (মাও সে তুং) বলেন, এ আন্দোলন—

‘সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদের বিরুদ্ধে চীনের বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এক নতুন পর্ব রচনা করেছিল। এর মধ্য দিয়ে যে সাংস্কৃতিক সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল তা এর একটি দিক মাত্র। সে সময়ে নতুন সামাজিক শক্তির বিকাশ ও বিস্তারের কালে শ্রমিক শ্রেণী, শিক্ষার্থী ও নতুন জাতীয় বুর্জোয়ার ঐক্যবদ্ধ শক্তিই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবে হাজির হয়েছিল। লাখ লাখ শিক্ষার্থী সাহসের সঙ্গে অংশ নিয়েছিল এ সংগ্রামে। এটি ১৯১১-এর বিপ্লবকে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।’ (নির্বাচিত রচনাবলি, দ্বিতীয় খণ্ড)

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সূচনাকাল

উনিশ শতকের শুরুতেই ফ্রান্সের সম্রাট নেপোলিয়ন চীন সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণ জানিয়েছিলেন এভাবে, ‘চীনের ঘুমিয়ে থাকাই ভালো। কারণ এ দেশ জেগে উঠলে সারা দুনিয়া তোলপাড় করবে।’ বস্তুত বিশ শতকের শুরু থেকেই নতুনভাবে চীনের বিশাল জনগোষ্ঠীর নতুনভাবে ‘জেগে ওঠা’র বিভিন্ন ধাপ তৈরি হয়। কৃষিপ্রধান বিস্তীর্ণ একটি অঞ্চলে, যার বহু এলাকা দুর্গম, একদিকে সামন্ত প্রভু অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদী বিভিন্ন শক্তির ক্রমবর্ধমান দাপটের মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি গঠন এবং তার দ্রুত বিকাশ বিস্ময়কর মনে হবেই। এ পার্টির যথাযথ ভূমিকার কারণে দ্রুতগতিতে চীনের রাজনৈতিক মানচিত্রে বিপ্লবী শক্তির বিকাশ ঘটতে থাকে।

১৯২০-এর দিকে চীনে ও চীনের বাইরে সমাজতন্ত্রী চিন্তা নিয়ে অনেকগুলো সক্রিয় গ্রুপের কার্যক্রম দেখা যায়। এ রকম অনেকগুলো গ্রুপের প্রথম সম্মিলিত কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালের জুলাইয়ে। পার্টি গঠনে এ উদ্যোগের পেছনে তৃতীয় আন্তর্জাতিক (১৯১৯-১৯৪৩) বা কমিনটার্নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। প্রতিষ্ঠা কংগ্রেসে অংশগ্রহণ করে যেসব গ্রুপ, তাদের নেতাদের মধ্যে ছিলেন: পিকিংএ লি তা-চাও, ক্যান্টনে চেন তু-সিউ, হুনানে মাও, শানতুঙে হুপেই। সাংহাইতে এ কংগ্রেস শুরু হয়, এটি স্থানান্তরিত হয় জিয়াক্সিনের সাউথ লেকে। নিরাপদ স্থান না পাওয়ায় লেকের ওপর ভাসমান নৌকাতেই কংগ্রেসের সফল সমাপ্তি ঘটে। সব গ্রুপের ভিন্ন নাম ও অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে জন্ম নেয় চীনা কমিউনিস্ট পার্টি।

মাও সে তুংয়ের (১৮৯৩-১৯৭৬) সঙ্গে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক তাই প্রথম থেকেই। তার কৈশোর ও বেড়ে ওঠার কাল ছিল চীনের নতুন চিন্তা ও সংগঠনের অভ্যুদয়কাল। ১৯১১ সালে চীন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগে ও পরে বিভিন্ন অঞ্চলে শোষণ, নির্যাতন, প্রতিরোধ, সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্ত প্রভু বিরোধী লড়াইয়ের ঘটনাপ্রবাহ এবং সমাজে চিন্তাভাবনার গতি খুব দ্রুত মাওকে পরিণত চিন্তা ও সক্রিয় সাংগঠনিক ব্যক্তিত্বে উন্নীত করে। মুক্তির চিন্তা ও মুক্তির লড়াইয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আগ্রহই তার জীবনের গতি নির্ধারণ করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার সীমিতই ছিল। বস্তুত স্বশিক্ষাই তাকে তৈরি করেছে। লাইব্রেরিতে নিয়মিত যাতায়াত ও পড়াশোনা, সহকারী লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করা এবং বিদ্যাজগতে নতুন নতুন চিন্তার সঙ্গে পরিচয় তার জীবনের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। মার্ক্সীয় সাহিত্যের সঙ্গে তার পরিচয় ১৯২০ সালে। তার আগেই তিনি কৃষক, ছাত্র ও শ্রমিক আন্দোলনের কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। লাইব্রেরিতেই তার যোগাযোগ হয় কমিউনিস্ট চিন্তা নিয়ে সক্রিয় ব্যক্তিদের সঙ্গে, যারা তখন বিভিন্ন পাঠচক্র ও গ্রুপের মাধ্যমে কাজ করতেন। ‘সমাজতান্ত্রিক যুব বাহিনী’ নামে একটি সংগঠনের হুনান শাখা সংগঠিত করেন মাও ১৯২০ সালে। তার সঙ্গে ছিলেন লিউ শাও চি। ১৯২১ সাল থেকে শুরু হয় তার পার্টি কার্যক্রম।

কমিউনিস্টদের আন্তর্জাতিক সংগঠন বা কমিনটার্নের তত্ত্বাবধানে পার্টি লেনিনীয় ধারায় পুনর্গঠিত হয় ১৯২৩ সালে। তবে বিভিন্ন কারণে কমিনটার্নে এ পার্টি সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা ছিল না। প্রতিষ্ঠাকালের কিছু পরই পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে কর্মকৌশল নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। কমিনটার্নের তদারকি ও তার ওপর নির্ভরশীলতা নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়। এর আগের বছর ১৯২২ সালে জরুরিভাবে আহূত কেন্দ্রীয় কমিটির প্লেনামে প্রস্তাব তোলা হয় যে পার্টি সদস্যরা জাতীয়তাবাদী কুওমিনটাং পার্টিতে যোগদান করুক। কেননা এটি জনগণের মধ্যে অনেক বেশি বিস্তৃত ও জনপ্রিয়। ভেতর থেকে একে পরিবর্তিত করা সহজ হবে। এ একই লাইন আমাদের অঞ্চলেও আমরা দেখেছি, দেখেছি তার পরিণতিও। এ লাইনেই অনেকে ভারতের কংগ্রেসে, পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে কাজ করেছেন। প্রায় সবাই এ কৌশলগত কাজ করতে করতে নিজেরাই দ্রবীভূত হয়েছেন। তবে চীনে শুরু একই রকম হলেও পরে পার্থক্য তৈরি হয়েছে।

চীনে পার্টির মধ্যে এ বিতর্কে তিনটি ধারা ছিল। একটির মতো ছিল কুওমিনটাং পার্টির সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখা যাবে না, কোনো যুক্তফ্রন্ট করা যাবে না। আরেকটি ধারার মত ছিল, এ কুওমিনটাং পার্টির সঙ্গে মিশে যেতে হবে। তৃতীয় মতটিই গৃহীত হয় যেখানে বলা হয়, নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব ও পরিচয় নিয়ে ওই পার্টিতে কমিউনিস্টরা কাজ করবে এবং নিজ শর্ত অনুযায়ী যুক্তফ্রন্ট গঠন করবে।

এ ঐক্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কুওমিনটাং পার্টিও কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নিয়েই কমিউনিস্টদের সঙ্গে কাজ করেছে। এ পার্টির মধ্যেও কমিউনিস্টদের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে ভিন্নমত ছিল।

সান ইয়াৎ সেন এ ঐক্যের বিষয়ে বরাবর আগ্রহী ছিলেন, তিনি কমিউনিস্টদের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল ছিলেন, নির্ভরযোগ্য মিত্র মনে করতেন। কমিউনিস্টদের একই সঙ্গে দুই পার্টির সদস্যপদ রক্ষার ব্যাপারে তার কোনো আপত্তি ছিল না। অনেকে সেভাবে ছিলেনও। লুকোচুরি, পরিচয় গোপন রাখার কোনো ব্যাপার ছিল না। ১৯২৫ সালে সান মৃত্যুবরণ করার পর কমিউনিস্ট বিদ্বেষীদের প্রভাব বাড়ে। এ কমিউনিস্ট বিরোধীদের মধ্যে সবচেয়ে সরব ছিলেন চিয়াং কাই শেক।

অভ্যন্তরীণ বিরোধ সত্ত্বেও কুওমিনটাং ও কমিউনিস্ট পার্টির যুক্তফ্রন্ট নেতৃত্ব সফলভাবে উত্তর অভিযান সম্পন্ন করে এবং বেশকিছু অঞ্চল সমরপ্রভুদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে। এ অভিযান সমাপ্তির পরই দুই পার্টির মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি নিজ স্বাতন্ত্র্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে দৃঢ় থাকায় কুওমিনটাং পার্টির সঙ্গে সম্পর্কে ওঠানামা হয়েছে, বৈরী অবস্থানও তৈরি হয়েছে, তবে ঠিকই বিকশিত হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি। এর মধ্যে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বেশ কয়েকটি মুক্ত অঞ্চল গঠন করতে সক্ষম হয়, যেগুলোকে তারা অভিহিত করত ‘সোভিয়েত অঞ্চল’ বলে। এর মধ্যে বৃহত্তম অঞ্চলটির নেতৃত্বে ছিলেন মাও সে তুং ও চু তে। [চলবে]

 

আনু মুহাম্মদ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়