রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভবনে একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এ ঘটনায় গত রাতে প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় অন্তত ২২ জন। বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছে আরো ১৬৯ জন। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এবং জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে হতাহতের এ সংখ্যা জানা গেছে।
এফটি-৭ বিজিআই মডেলের প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমানটি গতকাল বেলা ১টার কিছু সময় পর বিধ্বস্ত হয়। বিমানটিতে সঙ্গে সঙ্গেই আগুন ধরে যায়। হতাহতদের বেশির ভাগই অগ্নিদগ্ধ বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এ ঘটনায় আজ মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও গভীর শোক জানিয়েছেন এ ঘটনায়। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অনেক রাজনৈতিক দলের নেতাও শোক প্রকাশ করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারও যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তে হতাহতের ঘটনায় শোক জানিয়েছেন। সমবেদনা জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের ইন্দো-প্যাসিফিক বিষয়ক মন্ত্রী ক্যাথরিন ওয়েস্ট এবং ঢাকায় অবস্থিত জাপান দূতাবাসের অন্তর্বর্তীকালীন চার্জ দা অ্যাফেয়ার্স নাওকি তাকাহাশি।
জানা যায়, বিধ্বস্ত হওয়া এফটি-৭ বিজিআই মডেলের যুদ্ধবিমানটি নিয়মিত প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে গতকাল বেলা ১টা ৬ মিনিটে কুর্মিটোলায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি এ কে খন্দকার থেকে উড্ডয়ন করে। আইএসপিআর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিমানটি উড্ডয়নের পর যান্ত্রিক ত্রুটির সম্মুখীন হয়। দুর্ঘটনা মোকাবেলায় এবং বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পাইলট বিমানটিকে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে জনবিরল এলাকায় নিয়ে যাওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ঢাকার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের দোতলা একটি ভবনে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় সেটি বিধ্বস্ত হয়। এ ঘটনায় বিমান বাহিনী একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। এদিকে বিমান বাহিনীর একটি জরুরি সেল চালু করা হয়েছে, যা প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন হাসপাতালে রক্তদাতা পাঠানোর জন্য কাজ করছে।
প্রশিক্ষণ বিমানটি গতকাল বেলা ১টা ১৮ মিনিটে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে বিধ্বস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। অর্থাৎ সেটি উড্ডয়নের ১২ মিনিটের মধ্যে বিধ্বস্ত হয়। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের যে ভবনে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে সেখানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ক্লাস হতো বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। ঘটনার কিছুক্ষণ আগে ছুটি হয়ে গেলেও অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণীকক্ষ ও আশপাশে অবস্থান করছিল। শিক্ষার্থীদের নেয়ার জন্য অনেক অভিভাবকও ভবনের ভেতরে ছিলেন। ছুটির পর সেখানে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা কোচিং করত বলে জানা গেছে।
বিধ্বস্ত হওয়ার পরপরই উড়োজাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। আগুনের কারণে ওই সময় ভবন থেকে অনেকেই বের হতে পারেনি বলে গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহ বুলবুল। তিনি বলেন, ‘সেখানে অনেকেই দগ্ধ হয়েছেন।’ মাইলস্টোন স্কুলের এক শিক্ষক জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সময় ১০০ থেকে ১৫০ শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত ছিল। মাইলস্টোনের কো-অর্ডিনেটর মাহরিন চৌধুরী গত রাতে মারা যান। এ দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতরভাবে দগ্ধ হয়েছিলেন।
দুর্ঘটনার পর সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও ফায়ার সার্ভিস দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয়। ঘটনাস্থলে উৎসুক মানুষের ভিড়ের কারণে উদ্ধার তৎপরতা কিছুটা বিঘ্নিত হওয়ার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২-এ। আরো অন্তত ২৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অন্তত ১৫ শিশু বেশি দগ্ধ হয়েছে। এদের অনেকের দেহের প্রায় শতভাগ দগ্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
দুর্ঘটনার পর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাস ও আশপাশের পুরো এলাকায় উৎসুক জনতার ঢল নামে। এতে হতাহতদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় স্কাউট, বিএনসিসিসহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ, সেনাবাহিনী, আনসার, র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করে। আহত অনেককে অ্যাম্বুলেন্স, বাস, হেলিকপ্টরসহ বিভিন্ন বাহনে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। উদ্ধার তৎপরতার জন্য ক্রেনের মতো ভারী যন্ত্রপাতি আনতে দেখা যায়। রাত ৮টার কিছু সময় পর পর্যন্ত চলে উদ্ধার তৎপরতা। এ সময় ঘটনাস্থলের একজন স্বেচ্ছাসেবক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভেতরে আর কোনো হতাহত নেই। এখন শুধু বিমানটি সরানোর কাজ চলছে।’
রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় রাত সাড়ে ৮টায় উদ্ধারকাজ সমাপ্ত ঘোষণা করে ফায়ার সার্ভিস।
প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী, বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্কুল ভবনে আঘাত করে। ভবনের মধ্যে বিমানটির অর্ধেক ঢুকে যায়। এতে সরাসরি তিনটি ক্লাসরুম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আইএসপিআর থেকে জানানো হয়েছে, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ১২ জন, জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে দুজন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে দুজন, উত্তরার লুবনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে দুজন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন ও উত্তরা আধুনিক হসপিটালে একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মধ্যরাতে অবশ্য জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট আরো দুজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। এ ছয় হাসপাতালসহ কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল ও উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে সব মিলিয়ে ১৬৯ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।
অন্যদিকে নিহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় শনাক্ত করা যাবে তাদের মৃতদেহ দ্রুত পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার কথা জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, যাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যাবে না, তাদের মৃতদেহ ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করে পরে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরই মধ্যে কয়েকজনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিমান দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম গতকাল এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট পরিদর্শনে গিয়ে গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা) অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান জানান, নিহতদের মধ্যে সাতজনের মরদেহ শনাক্ত করা যায়নি। তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা লাগবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ৮৮ জন হাসপাতালে ভর্তি আছে। প্রাথমিক মূল্যায়নে ২৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’
এদিকে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আগামী তিনদিন জুলাই পুনর্জাগরণের সব অনুষ্ঠান স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।















