সাধারণত বাজারে কোনো পণ্যের সরবরাহ কমে গেলে বা প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে তার দাম বেড়ে যায়। তবে বর্তমানে দেশের বাজারে সবচেয়ে আলোচিত ভোগ্যপণ্য ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে এ সূত্র কাজ করছে না। কারণ বিদেশ থেকে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ সয়াবিন ও পাম অয়েলবাহী জাহাজ বাংলাদেশের জলসীমায় পৌঁছেছে। সেসব জাহাজ এখন চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করছে। আবার গত বছর দেশের উদ্যোক্তাদের আমদানি করা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সয়াবিন ও পাম অয়েলের শুল্কায়ন করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলেও দেশে এখন সংকটের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কথা নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, এ মুহূর্তে বহির্নোঙরে তিনটি জাহাজে খালাসের জন্য অপেক্ষমাণ ৩৬ হাজার টন ভোজ্যতেল। এর মধ্যে সুমাত্রা পাম ভেসেলে ১২ হাজার টন পাম অয়েল, সানজিন-৩০২৫ ভেসেলে ১২ হাজার টন সয়াবিন এবং আরএম-১০ নেপচুনে ১২ হাজার টন সয়াবিন তেল এনেছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। জাহাজগুলো থেকে তেল স্থানান্তর কার্যক্রম এখনো চলছে। কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে এসব তেল যাবে রিফাইনারিগুলোতে। এরপর এসব তেলও যুক্ত হবে বাজারে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন পর্যন্ত তেল সরবরাহে কোনো সংকট সৃষ্টি হয়নি।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সয়াবিন ও পাম অয়েল মিলিয়ে ভোজ্যতেলের মোট বার্ষিক চাহিদা ২০ লাখ টন। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় দুই লাখ টন, বাকিটা আমদানি করতে হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত বছর ইন্ডাস্ট্রিয়াল (শিল্প খাতে) সুবিধায় আমদানি হওয়া ১৮ লাখ ১৮ হাজার টন (পরিশোধিত ও অপরিশোধিত) ভোজ্যতেলের শুল্কায়ন করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। আমদানি শুল্কায়ন বিবেচনায় নিলে ভোজ্যতেল আমদানির প্রায় পুরোটাই টিকে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও এস আলম গ্রুপ এই চার প্রতিষ্ঠানের অধীনে হয়েছে। এর বাইরে বাণিজ্যিক সুবিধায় কিছু তেল দেশের বাজারে আসে।
বিদেশ থেকে পাম ও সয়াবিন তেল পরিশোধিত ও অপরিশোধিত আকারে আমদানি হয়। অপরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা সয়াবিন স্থানীয়ভাবে পরিশোধনের পর বাজারজাত হয়। তবে দেশের বাজারে ব্যবহার ও আমদানি বেশি হয় প্রধানত পরিশোধিত পাম অয়েল। আমদানি তথ্য বলছে, গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি শুল্কায়ন হয়েছে ১২ লাখ ১৬ হাজার টন পরিশোধিত (রিফাইনড) পাম অয়েলের। এর পরই রয়েছে অপরিশোধিত (ক্রুড) সয়াবিন ৬ লাখ ৩ হাজার টন। আমদানি হওয়া পাম অয়েলের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার এ দুই দেশের ওপর নির্ভরতা রয়েছে দেশের ব্যবসায়ীদের। তবে সয়াবিন আসছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা থেকে।
দেশের ব্যবসায়ীরা আমদানি অব্যাহত রেখেছেন বলে জানান সয়াবিন বাজারজাতকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠান টিকে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ভোজ্যতেলের দাম আমদানি মূল্যের অনুপাতে যুক্তিসংগত হওয়া জরুরি। এতে বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক থাকে। আমরা এখনো আমদানি অব্যাহত রেখেছি। নভেম্বরে আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে যে আবেদন দেয়া হয়েছিল তখন ১ হাজার ২৮০ ডলার লেভেলে ছিল। ফেব্রুয়ারিতে এসে দাম পুনর্নির্ধারণ করে সরকার। এখন ২০০ ডলারের বড় পার্থক্য হয়ে গিয়েছে। এক বছর আগে সয়াবিন তেলের বুকিং ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ ডলার। কিন্তু বর্তমানে সেটি ১ হাজার ৮০০ ডলারে পৌঁছেছে।
ফলে দাম যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা না হলে স্বাভাবিকভাবেই এলসি খোলার হার কমে আসবে বলে মন্তব্য করেন এ ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, কারণ আন্তর্জাতিক যে পরিস্থিতি বর্তমানে বিরাজ করছে তাতে সামনে কী হবে তা আমরা বলতে পারি না। ২০০৮ সালে আন্তর্জাতিক টালমাটাল পরিস্থিতিতে ভোজ্যতেল ব্যবসা থেকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের ছিটকে পড়ার ঘটনাও আমরা দেখেছি। তাই এখন সরকার যদি ভ্যাট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয় তবে ভোক্তা পর্যায়ে কিছুটা স্বস্তি মিলবে।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের ইতিহাসে ভোজ্যতেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে এখন। ব্যবসায়ীরা বারবার আন্তর্জাতিক বাজারের কথা উল্লেখ করে দাম বাড়ান। এবার যেহেতু সরবরাহ এখনো ঠিক আছে, পর্যাপ্ত তেল মজুদ রয়েছে তাই কেন দাম বাড়ানো হচ্ছে, কারা এর পেছনে দায়ী তা চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে তদারকি সংস্থাকে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণ দেখিয়ে রিফাইনারি কোম্পানিগুলো হঠাৎ করেই তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দরে যে সয়াবিন ও পাম অয়েল পৌঁছেছে সেগুলো দ্রুত স্থানান্তর করে খালাসের উদ্যোগ নেয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ হিসেবে অতীতের কিছু উদাহরণ টানা হচ্ছে। যখন পণ্য দেশের জলসীমায় পৌঁছার পরও খালাসে বিলম্ব করে ভোক্তা পর্যায়ের বাজারমূল্য উসকে দেয়া হয়েছিল।










