বর্তমানে বাজারদর নিম্নমুখী থাকায় রংপুর অঞ্চলে কৃষকরা এবার আলু চাষে তেমন উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। অনেক কৃষক দোটানায় পড়েছেন আসন্ন মৌসুমে আলু চাষে জমির পরিমাণ কমাবেন নাকি গতবারের মতোই বেশি জমিতে চাষ করবেন। গত বছর এ সময় কৃষকরা আগাম আলুবীজের বুকিং দিলেও এবার এখনো তেমন সাড়া নেই।

এদিকে চলতি মৌসুমে দরপতনে অনেকে হিমাগার থেকে আলু বের করেননি। ফলে প্রায় ৫০ ভাগ আলুই অবিক্রীত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অবিক্রীত আলু আবার ব্যাপক হারে বীজ হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। ফলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা আসন্ন মৌসুমে আলু চাষে বিপর্যয়ের শঙ্কাও করছেন। যদিও রংপুর অঞ্চলে ২০২১-২২ মৌসুমে সরকারি বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) আলুবীজের বরাদ্দ রয়েছে ৩ হাজার ৭১৭ দশমিক ৮৮ টন।

খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৯-২০ মৌসুমে আলুর দাম ভালো পাওয়ায় পরের বছর ২০২০-২১ মৌসুমে চাষীরা ব্যাপকহারে আলু চাষ করেন। তবে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েন তারা। ফলে এ বছর (২০২১-২২) অনেকে আলুর আবাদ করবেন কিনা তা নিয়ে দোটানায় আছেন।

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার আলু চাষী আতাউর রহমান বলেন, সাড়ে ১৬ দোন (২৪ শতকে ১ দোন) জমিতে এস্টারিস জাতের আলু আবাদ করে দোনপ্রতি আলু পেয়েছেন ৪০ বস্তা (৯০ কেজির বস্তা) আলু। উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ৪ লাখ টাকা। কোল্ড স্টোরেজে আলু রাখায় বস্তাপ্রতি আলুর ভাড়া যোগ হয়েছে ২৭০ টাকা। বর্তমান বাজার মূল্যে প্রতি মণ আলুর দাম ৬০০ টাকা ধরে তার সব আলু বিক্রি করলেও লাভ তো দূরের কথা, আসল টাকা তোলাই কঠিন হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় আলু চাষ নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন তিনি। আতাউরের মতো অনেক চাষী আলু আবাদ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

বিএডিসি রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালকের (বীজ বিপণন) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে (২০২১-২২) আলুবীজের মোট বরাদ্দ ৩ হাজার ৭১৭ দশমিক ৮৮ টন। এর মধ্যে ৫ জেলার ৭২৬ জন নিবন্ধিত ডিলারের জন্য বরাদ্দ ২ হাজার ৯৫০ দশমিক ৮০০ টন এবং কৃষক, বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও এনজিওর বরাদ্দ হচ্ছে ৭৬৬ দশমিক ২৮৮ টন।

রংপুর জেলায় বিএডিসি নিবন্ধিত ডিলার ১৯২ জন। এছাড়া গাইবান্ধায় ১৩০ জন, কুড়িগ্রামে ১৬১, নীলফামারীতে ১৩০ ও লালমনিরহাটে ডিলার ১১৩ জন। রংপুর জেলার প্রত্যেক ডিলারের জন্য ন্যূনতম বরাদ্দ হচ্ছে ৪ দশমিক ৮০০ টন। বাকি জেলার ডিলারদের প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ ৩ দশমিক ৮০০ টন।

আলুর জাতগুলো হচ্ছে কার্ডিনাল, ডায়মন্ড, গ্রানুলা, লেডিরসেটা, বারি আলু, কারেস ও এস্টারিস অন্যতম। কৃষক পর্যায় প্রতি কেজি বীজ আলুর বিক্রয় মূল্য ২২-২৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর (২০২০-২১) আলুবীজের মোট বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ৮১৬ দশমিক ৭৭৯ টন। কৃষক পর্যায় আলুবীজের বিক্রয় মূল্য ছিল প্রতি কেজি ৪৬-৪৮ টাকা।

রংপুরের বিএডিসি (বীজ ও সার) ডিলার মো. ফিরোজ আলম বলেন, এখন পর্যন্ত কৃষকরা আলুবীজের জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। অথচ গত বছর আগাম টাকা দিয়েছিলেন কৃষকরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আবু সায়েম বলেন, বর্তমানে আলুর মূল্য না পাওয়ায় অনেক কৃষক প্রকৃত বীজ আলু ব্যবহার না করে খাবার আলু বীজ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। এতে উৎপাদনে ঝুঁকি নেয়া হবে বলে তিনি সতর্ক করে দেন।

রংপুর বিএডিসির (বীজ বিপণন) উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আসাদুজ্জামান খান বলেন, বর্তমানে আলুর বাজার নিম্নমুখী হওয়ায় এবার আলু চাষে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

তবে যেহেতু অনেকের আলু অবিক্রীত আছে, তাই কেউ কেউ খাবার আলু বীজ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তিনি এ ধরনের প্রবণতা বন্ধ করার আহ্বান জানান। এতে ফলন বিপর্যয়সহ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে বলে তিনি জানান। তবে তিনি আশাবাদী, যেহেতু বিএডিসির বীজ মানসম্পন্ন তাই সচেতন কৃষকরা অবশ্যই এ বীজ ব্যবহার করবেন।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে আলু আবাদের জমি ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে যথাক্রমে ৯৭ হাজার ১২৫ হেক্টর এবং ২২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৯৬ টন।