ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকার বাসযোগ্যতা ফেরাতে গত বছরের আগস্টে গেজেটভুক্ত হয় রাজধানীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ)। প্রথমবারের মতো ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) পদ্ধতিতে এলাকাভিত্তিক ভবনের উচ্চতা নির্ধারণ করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। গেজেট হওয়ার পর পরই নতুন ড্যাপের এফএআর নিয়ে তুমুল বিতর্ক ওঠে হাউজিং প্রতিষ্ঠান ও ডেভেলপারদের পক্ষ থেকে। তবে রাজউক বারবার বলে আসছে, ঢাকার বাসযোগ্যতা ফেরাতে হলে এর চেয়ে বেশি এফএআর নির্ধারণ বা ভবনের উচ্চতা বৃদ্ধির সুযোগ নেই। কিন্তু বছর না ঘুরতেই প্রভাবশালী হাউজিং ও ডেভেলপারদের চাপে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে রাজউক। 

সূত্র বলছে, অন্তত তিন বছরের জন্য সরকারি ও বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে ভবনের উচ্চতার ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারির সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ। অথচ ড্যাপ রিভিউর জন্য গঠিত কারিগরি কমিটির সঙ্গেও কোনো সভা করেনি রাজউক। সংশোধিত ড্যাপে নগর পরিকল্পনাবিদদের সুপারিশ উপেক্ষিত থাকায় ঢাকার বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে মনে করেছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। 

জানা গেছে, গত ১২ জুলাই ড্যাপ সংশোধনের একটি সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রণয়ন করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সেখানে সরকারি ও বেসরকারি আবাসন কেন্দ্রকে তিন বছরের জন্য ভবনের উচ্চতার বিষয়ে দশমিক ৫ ফ্লোর এরিয়া রেশিও প্রণোদনাসহ ১১টি প্রস্তাব উল্লেখ করা হয়। ২০ জুলাই প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন। বর্তমানে সংশোধিত ড্যাপ প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় রয়েছে। যেকোনো দিন প্রজ্ঞাপন প্রকাশের মাধ্যমে সংশোধনের বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হবে। 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা নয়, বরং জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্যই ড্যাপ সংশোধন হচ্ছে। নতুন ড্যাপ বাস্তবায়নের জন্য এটা একটা ব্রিদিং টাইম বা স্বস্তির নিশ্বাস বলতে পারেন। নির্দিষ্ট সময় পর কিন্তু আবার নতুন ড্যাপে ফিরে যাব আমরা। সংশোধনীতে সব যে কেবল এফএআর বাড়ানো হচ্ছে তা নয়, সেখানে অন্যান্য বিষয়ও বলা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ড্যাপে প্রস্তাবিত রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য জমির সীমানা বরাবর যে পরিমাণ জমি ছেড়ে দেয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে সেটি স্থানীয় সরকারের মালিকানায় দিয়ে দিতে হবে। তাছাড়া পার্ক, খেলার মাঠসহ অন্যান্য যে নাগরিক সুবিধার শর্তারোপ নতুন ড্যাপে করা হয়েছে সেগুলোর কোনোটিই পরিবর্তন করা হচ্ছে না।’ 

ড্যাপ গেজেট হওয়ার পর ফ্লোর এরিয়া রেশিওর বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানায় আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) ও বাংলাদেশ ল্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশন (বিএলডিএ)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ মার্চ গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের সভাপতিত্বে একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আবাসন খাতের নেতারা তাদের দাবি তুলে ধরেন। সভার সিদ্ধান্তের আলোকে গত ১৮ মে রাজউকের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিয়ার সভাপতিত্বে ড্যাপ বাস্তবায়নসংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ড্যাপে ১১টি সংশোধনের জন্য প্রস্তাব করা হয়। 

প্রথম প্রস্তাবে বলা হয়, নতুন ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশের আগে জমির মালিক ও ডেভেলপারের মধ্যে রেজিস্টার্ড চুক্তি হয়ে থাকলে আগের ড্যাপ ও ঢাকার মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী প্রযোজ্য এফএআর অনুযায়ী ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়া যাবে।

এ প্রস্তাবের যৌক্তিকতা সম্পর্কে বলা হয়, জমির মালিক ও ডেভেলপারদের মধ্যে আগে সম্পাদিত চুক্তির ক্ষেত্রে নতুন ড্যাপ আরোপের কারণে যদি ফ্ল্যাটের আয়তন সংকুচিত হয় সেক্ষেত্রে উভয় পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এ গ্রেস পিরিয়ডের বিষয়টি বিবেচনা করা যৌক্তিক। 

দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আগামী তিন বছরের জন্য সরকারি-বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে ভবন নির্মাণে আগ্রহী আবেদনকারীদের নাগরিক সুবিধা দিতে নির্ধারিত স্থান সংরক্ষণের কারণে প্রণোদনা হিসেবে অতিরিক্ত দশমিক ৫ এফএআর দেয়া যেতে পারে। এর যৌক্তিকতা হিসেবে বলা হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার চেয়ে নাগরিক সুবিধা বেশি থাকে এবং ওইসব এলাকায় জনধারণক্ষমতাও বেশি। তাছাড়া এতে শহর বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে সরকারের লক্ষ্যও বাস্তবায়ন হবে। 

তৃতীয় প্রস্তাবে অপরিকল্পিত ও বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠা নগর এলাকা যেমন বাড্ডা-ডেমরা, খিলক্ষেত, উত্তরখান, দক্ষিণখান, রায়েরবাজার, সাভার, কেরানীগঞ্জ ইত্যাদিতে দশমিক ৫ ফ্লোর প্রণোদনার সুপারিশ করা হয়েছে। চতুর্থ প্রস্তাবে ব্লকভিত্তিক আবাসন প্রকল্প, ষষ্ঠ প্রস্তাবে সাশ্রয়ী আবাসন, সপ্তম প্রস্তাবে একত্রীভূত প্লটের ক্ষেত্রে এফএআর বৃদ্ধির বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

এফএআর বৃদ্ধির বিষয়টি আবাসন ব্যবসায়ীদের কাছে রাজউকের লজ্জাজনক পরাজয় বলে মনে করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তার মতে, ড্যাপের মতো একটি সুন্দর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রভাবশালীরা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবেন, এমনটা হওয়ারই ছিল। 

ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের কাছে সুন্দর পরিকল্পনার চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ ও মুনাফা করাটাই প্রাধান্য পায়। এর বিপরীতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শহরের বাসযোগ্যতা, টেকসই পরিবেশ, সামগ্রিক জনস্বার্থ ও জনস্বাস্থ্য সমুন্নত রাখা। ড্যাপ যে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং প্রভাবশালীদের স্বার্থের কাছে নতি স্বীকার করবে, এ ধরনের শঙ্কা আমাদের ছিল। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক, এক বছর না যেতেই ড্যাপ তার মূলনীতি তথা বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার অঙ্গীকার থেকে সরে আসছে। ব্যবসায়িক চাপ ও গোষ্ঠীতন্ত্রের কাছে নতি স্বীকার করা রাজউক তথা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে বাসযোগ্য নগর গড়ার উদ্যোগগুলো একে একে মুখ থুবড়ে পড়ছে।’

ড্যাপ রিভিউর জন্য গত ১৭ জানুয়ারি এক অফিস আদেশের মাধ্যমে কারিগরি কমিটি গঠন করে রাজউক। আদেশে বলা হয়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রণীত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০২২-৩৫) গত ২৩ আগস্ট গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার কতিপয় বিষয় পুনর্বিবেচনার জন্য বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সুপারিশমালার ওপর আলোচনাপূর্বক ড্যাপ রিভিউ-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বরাবর উপস্থাপনের জন্য ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হলো। গঠিত ওয়ার্কিং কমিটিতে মতামত দেয়ার জন্য ১১ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) দুজন, আইইবির দুজন, ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইইবি) দুজন প্রতিনিধি থাকবেন। এছাড়া রাজউক থেকে চেয়ারম্যান, পরিকল্পনা সদস্য, উন্নয়ন সদস্য, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ সদস্য, নগর স্থপতি, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১ সদস্য ও দুজন নগর পরিকল্পনাবিদকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। কিন্তু সে কমিটির কোনো সভা না ডেকেই ড্যাপ সংশোধন হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের (আইএবি) পরিবেশ ও নগরায়ণ সম্পাদক এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক স্থপতি সুজাউল ইসলাম খান। 

স্থপতি সুজাউল ইসলাম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ড্যাপ নিয়ে আমাদের বেশকিছু সুপারিশ ছিল। পর্যালোচনা ছিল। রাজউক থেকে একটি ওয়ার্কিং কমিটিও করা হয়েছে। এ নিয়ে রাজউকের একজন কর্মকর্তার সঙ্গে কয়েকবার আলাপও হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো আজ পর্যন্ত ওই কমিটির কোনো পূর্ণাঙ্গ সভা হয়নি। আমরা আমাদের বিস্তারিত প্রস্তাবগুলো সরকারের কাছে জমা দিয়েছি। তাহলে এখন যে ড্যাপ সংশোধন হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে সেটা কিসের ভিত্তিতে হচ্ছে? আমরা চাই এফএআর নির্ধারণের প্রক্রিয়া যৌক্তিক, স্বচ্ছ ও স্পষ্ট হোক।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘রাজউককে লিখিতভাবে আমাদের প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা বলেছি, কৃষিজমি ও জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য কর্মসংস্থান, সামাজিক ও ভৌত অবকাঠামো আছে এমন পৌর এলাকায় নগরায়ণকে সীমিত করতে হবে। ড্যাপে আছে, বর্তমানে ঢাকার প্রায় ৭২০ বর্গকিলোমিটারে ২ কোটি ২৫ লাখ লোক থাকতে পারবে। ২০৩৫ সালে ড্যাপ অনুযায়ী ঢাকার প্রক্ষেপিত জনসংখ্যা ২ কোটি ৬০ লাখ। এই বাড়তি ৩৫ লাখ লোকের জন্য ড্যাপে প্রস্তাব করছে ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের নগর অঞ্চল। এতে বিস্তীর্ণ এলাকার জলাভূমি, প্লাবনভূমি ও কৃষিজমি অকারণে ধ্বংস হবে। আগামীর ভঙ্গুর ঢাকার জন্য রাজউক কি দায়ভার এড়াতে পারবে?’ 

সার্বিক বিষয়ে রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন কাজল বলেন, ‘বাস্তবসম্মত যেসব দাবি ছিল সেগুলো আমরা সরকারের উচ্চমহল পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছি, যে কারণে ড্যাপ এখন রিভিউ হয়ে আসছে।’