দুই দশকের ব্যবধানে দেশে জনপ্রতি দৈনিক মাছ গ্রহণের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চাহিদা বেড়ে চললেও সংকুচিত হচ্ছে মাছের প্রাকৃতিক উৎস। বিশেষ করে নদীকেন্দ্রিক মাছ উৎপাদন একেবারেই কমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্লাবনভূমিগুলোয়ই মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনাময় উৎস। কার্যকর ব্যবস্থাপনায় দেশের আট প্লাবনভূমি থেকে আসতে পারে বছরে ৫০ লাখ টন মাছ।
দেশে মোট প্লাবনভূমির পরিমাণ ২৭ লাখ হেক্টর। সেখানে প্রাকৃতিকভাবে বছরে প্রায় আট লাখ টন মাছ উৎপাদন হচ্ছে বর্তমানে। বছরে অর্ধেক সময়জুড়ে মোট প্লাবনভূমির প্রায় ৪০ শতাংশ বা ১৫ লাখ ৭ হাজার ৬০০ হেক্টর জায়গায় মোটামুটি ৮-১০ ফুটের ওপর পানি থাকে। এসব জায়গায় ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ করলে বছরে মাছ উৎপাদন ৪-৫ গুণ বৃদ্ধি বা ৩৫-৪০ লাখ টনে উন্নীত করা সম্ভব বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে। আর সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে চাষ করা গেলে উৎপাদন খুব সহজেই ৬০ লাখ টনে উন্নীত করা যাবে। সে হিসেবে বছরে প্রায় ৫২ লাখ টন বাড়তি মাছ উৎপাদন সম্ভব হবে।
যেখানে প্লাবনভূমিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে, সেখানে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতিও হয়েছে। এরই মধ্যে কুমিল্লার দাউদকান্দি, সিলেটের গোলাপগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, পাবনা ও বরিশালের কিছু অঞ্চলের প্লাবনভূমিতে মাছ চাষে সফলতা এসেছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেখানে মাছ উৎপাদন হেক্টরপ্রতি এক টনের নিচে, সেখানে এসব প্লাবনভূমিতে উৎপাদন তিন থেকে সাড়ে চার টন পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে।
মত্স্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের মোট প্লাবনভূমির ২ শতাংশ পরিমাণ জমিকে কাজে লাগাতে পারিনি। মাঝেমধ্যে কিছু প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু সেটির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তবে প্লাবনভূমিতে মাছ চাষের জন্য অ্যাকুয়াকালচার পদ্ধতি অবলম্বন করলেই হবে না। এর সঙ্গে স্থানীয় কমিউনিটিকে সঠিকভাবে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত উদ্যোগগুলো খামারিদের মাঝে সম্প্রসারণ করতে হবে। এ অঞ্চলে মাছ উৎপাদন বাড়লে মত্স্য প্রক্রিয়াজাতের সঙ্গে অন্যান্য শিল্প বিকশিত হবে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের একটি বিরাট অংশজুড়ে বিস্তৃত বিভিন্ন নদ-নদী সৃষ্ট আটটি প্লাবনভূমি এলাকা রয়েছে। এগুলো হচ্ছে পদ্মা, আত্রাই, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, মেঘনা, সুরমা-কুশিয়ারা, পুরনো ব্রহ্মপুত্র অধ্যুষিত প্লাবনভূমি ও হাওড় বেসিন। এর মধ্যে একমাত্র মেঘনা অধ্যুষিত প্লাবনভূমি ছাড়া অন্য প্লাবনভূমিগুলো উঁচু। মেঘনা অধ্যুষিত প্লাবনভূমিতে পানির স্থায়িত্বকাল গড়ে পাঁচ-ছয় মাস। এছাড়া পুরনো ব্রহ্মপুত্র অধ্যুষিত প্লাবনভূমি ও সুরমা-কুশিয়ারা প্লাবনভূমির অন্তর্ভুক্ত হাওড় অঞ্চলগুলোতে (সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা) বছরে ন্যূনতম পাঁচ-ছয় মাস এবং কিছু জায়গায় সারা বছর পানি থাকে। ফলে আগামী দিনে মাছের চাহিদা পূরণে প্লাবনভূমি সবচেয়ে বড় অবদান রাখতে পারে বলে আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেডের এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
ওই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, প্রাথমিকভাবে প্লাবনভূমিতে ভাসমান খাঁচায় বিভিন্ন ধরনের কার্প, পাঙ্গাশ ও বিশেষ করে তেলাপিয়া মাছ চাষ করা যাবে। ভাসমান খাঁচায় ভালো জাতের তেলাপিয়া মাছ চাষ করলে চার-পাঁচ মাসে ৫০০ গ্রাম হয়ে থাকে। আবার প্লাবনভূমির যেখানে পাঁচ ফুটের নিচে পানি থাকে, সেখানে বাণিজ্যিকভাবে শামুক, ঝিনুক ও কুঁচিয়া চাষ করা সম্ভব।
আফতাব বহুমুখী ফার্মস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু লুেফ ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, প্লাবনভূমিগুলো বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের উপযোগী করতে বেশকিছু কার্যক্রম বাস্তবায়ন প্রয়োজন। প্রথমত, নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে শিক্ষিত ও বেকার যুবকদের ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোকে প্লাবনভূমিতে মাছ চাষ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে অর্থায়ন সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি ভাসমান খাঁচায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কম সময়ে অধিক বৃদ্ধিসম্পন্ন মাছ উৎপাদন করতে হবে। এছাড়া ১৪০-১৫০ দিনের মধ্যে ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ করে বিক্রি করা যায় এমন মাছের জাত গবেষণার মাধ্যমে উন্নয়ন করা প্রয়োজন। এ ধরনের মত্স্য খামার পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন সুবিধা দিতে হবে।
মত্স্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মাছ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার টন। বর্তমানে দেশের একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬৩ গ্রাম মাছ গ্রহণ করলেও ২০৩০ সালের মধ্যে জনপ্রতি ভোগ ৬৮ গ্রামে উন্নীত হতে পারে। তখন মাছের প্রয়োজন হবে ৫০ লাখ টনের বেশি। ২০০০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে মাছের চাহিদা প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ভোগের এ পরিবর্তন আগামী এক দশক চলমান থাকবে। মাছের চাহিদা ২০২৫ সালে ৩৪ শতাংশ বাড়াবে। যদিও ২০৩০ সালে তা ৫৬ শতাংশে উন্নীত হবে। মাছ চাষের ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় বিষয়টি কাজে লাগাতে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় প্লাবনভূমিতে মাছ চাষের বিষয়ে দিকনির্দেশনা রাখা হয়েছে।










