মিয়ানমারের রাখাইনে দেশটির সরকারি বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির লড়াই গতকালও অব্যাহত ছিল। লড়াইয়ে টিকতে না পেরে এদিন নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন সরকারি বাহিনীর আরো ৬৩ সদস্য। পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন গতকাল জানিয়েছেন, চলমান সংঘাতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপিসহ বিভিন্ন সংস্থার ৩২৯ সদস্য বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। সূত্র বলছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এ-সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সমুদ্রপথে তাদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্ত দিয়ে গতকাল দুপুরে নতুন করে মিয়ানমারের ৬৩ সেনা ও বিজিপি সদস্য বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেন। পরে তাদের নিরস্ত্রীকরণ শেষে হেফাজতে নেয় বিজিবি। হোয়াইক্যংয়ের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকালে সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যায়। পরে বর্মি জান্তা বাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে দেখেন তারা।

মিয়ানমারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এদিন দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এতে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভাগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। মিয়ানমার থেকে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. মনোয়ার হোসেন।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করা মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর সদস্যদের ফেরত পাঠানো নিয়ে ঢাকা ও নেপিদোর মধ্যে মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। মিয়ানমার চেয়েছিল, তাদের লোকজনকে নাফ নদ হয়ে ফিরিয়ে নিতে। তবে এতে আপত্তি জানায় বাংলাদেশ। কেননা, ফেরত পাঠানোর সময় আরাকান আর্মি যে হামলা চালাবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এক্ষেত্রে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটলে তার দায় বাংলাদেশের ওপরও বর্তাবে। ফলে অনুপ্রবেশকারীদের আকাশপথে ফেরত পাঠানোর প্রস্তাব দেয় ঢাকা। কিন্তু মিয়ানমার এতে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সমুদ্রপথে তাদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। 

বৈঠক শেষে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের ৩২৯ নাগরিককে কীভাবে ফিরিয়ে দেয়া যাবে, সেটাই আমাদের আলোচ্য বিষয় ছিল। এখানে যেসব লোক আছেন, তাদের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। তবে আমরা তাদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে আকাশপথে অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম। তারা সমুদ্র দিয়ে ফেরত নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহী। ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যেটা সবচেয়ে নিরাপদ ও দ্রুততম সময়ে করা যায় সেটাই আমাদের অগ্রাধিকার থাকবে।’ 

এদিকে নতুন করে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলীয় আরেক শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার দাবি করেছে আরাকান আর্মি। বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি বলছে, মঙ্গলবার মিনবিয়া শহরে থাকা সরকারি বাহিনীর শেষ দুটি ঘাঁটির দখল নিয়েছে তারা। এ সময় সরকারি বাহিনীর কয়েক ডজন সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যরা আত্মসমর্পণ করে। গতকাল শিন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারও গুলি করে ভূপাতিত করার দাবি করেছে আরাকান আর্মি। গোষ্ঠীটির মুখপাত্র খাইং থুখা জানান, রাজ্যের পালেতওয়া টাউনশিপে তীব্র লড়াইয়ের সময় হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত করা হয়। তবে বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে মঙ্গলবার রাত থেকে গোলাগুলির আওয়াজ কিছুটা কমে আসে। তার পরও স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এরই মধ্যে অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে।

বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী গতকাল বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুনধুম সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, জান্তা বাহিনীর অনুপ্রবেশকারী সদস্যদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার প্রস্তুত রয়েছে। 

মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, ‘সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিজিবির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে ধৈর্য ধারণ করে, মানবিক থেকে এবং আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন অবৈধভাবে আর একজনকেও বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়া হবে না। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সীমান্তে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিজিবি সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত রয়েছে।’