দেশের অন্যতম ট্রেড মার্কের জন্ম যার হাতে, তার জীবদ্দশায়ই দেউলিয়া হওয়ার পথে রয়েছে নাভানা গ্রুপ। শিল্প গ্রুপটির চেয়ারম্যান হিসেবে এখনো দায়িত্ব পালন করছেন শফিউল ইসলাম কামাল। সত্তরোর্ধ্ব এ শিল্পোদ্যোক্তা বর্তমানে শারীরিকভাবে অসুস্থ। ঠিকমতো কাউকে চিনতে পারেন না। স্মৃতিশক্তিও লোপ পাচ্ছে ধীরে ধীরে। স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি জীবন যাপন করছেন দুই বছরের বেশি সময় ধরে। লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাওয়া দেশের প্রথম প্রজন্মের এ শিল্পোদ্যোক্তার উত্তরাধিকারীরাও এখন অনেকটাই দিশাহীন।
শফিউল ইসলাম কামালের তিন ছেলের মধ্যে পিতার ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন দুজন—সাইফুল ইসলাম সুমন ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্র। নাভানা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তারা। পাশাপাশি দুজনই নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে বিচক্ষণ ব্যবসায়ী হিসেবে পিতার মতো সুনাম অর্জন করতে পারেননি দুজনের কেউই।
তাদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম সুমন দেশান্তরী হয়েছেন দুই বছর আগে। স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন কানাডায়। ব্যবসায় যুক্ত আছেন দায়সারাভাবে। আরেক ছেলে সাজেদুল ইসলাম শুভ্রর ব্যবসায়িক পরিস্থিতিও ভালো নয়। পিতার সম্পদ ও কোম্পানির উত্তরাধিকার নিয়ে এ দুই ভাইয়ের বিরোধের কথাও ছড়িয়ে পড়েছে করপোরেট জগতে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শফিউল ইসলাম কামালের স্ত্রী খালেদা ইসলাম শিল্প গ্রুপটির নেতৃত্বে আসছেন বলে জানা গিয়েছে।
এদিকে নাভানা গ্রুপকে দেয়া ঋণ আদায় নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন ব্যাংকাররা। দেশের অন্তত ৪০টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছে শিল্প গ্রুপটি। অনাদায়ী সুদ যুক্ত হতে হতে শিল্প গ্রুপটির মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ছুঁয়েছে। করোনার আগেই নাভানা গ্রুপের বেশির ভাগ ঋণ খেলাপির খাতায় উঠেছিল। তবে অতীতের ব্যবসায়িক সুনাম ও ব্যাংকের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে খেলাপি হওয়া ঋণগুলো দফায় দফায় পুনঃতফসিল করেছে ব্যাংকগুলো। তাতে খুব একটা লাভ হয়নি। গত দুই বছরে নাভানা গ্রুপের কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে।
এরই মধ্যে লোকসানে চলে গিয়েছে গ্রুপটির একসময়কার সবচেয়ে লাভজনক কোম্পানি আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেড। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির নামে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণ রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানিটি ১৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা নিট লোকসান দিয়েছে। এ কোম্পানিরই একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হিনো বাসের চেসিস সংযোজন করে। খেলাপি হওয়ায় ওই ইউনিটের নামে কোনো ব্যাংক জাপান থেকে চেসিস আনার ঋণপত্র খুলছে না। ফলে গত জুলাই থেকে বন্ধ হয়ে গিয়েছে আফতাব অটোমোবাইলসের ওই ইউনিট। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে গিয়েছে মাহিন্দ্রা মোটরসাইকেল তৈরির জন্য নির্মিত নাভানার কারখানাটিও। আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান নাভানা ব্যাটারি। চাহিদা পড়তির দিকে থাকায় বাজারে প্রতিষ্ঠানটির বিক্রিও খুব একটা ভালো না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ভালো নয় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নাভানা গ্রুপের আরেক কোম্পানি নাভানা সিএনজি লিমিটেডেরও। ২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানিটি নিট মুনাফা করেছে মাত্র দেড় কোটি টাকা। দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে নাভানা সিএনজির নামে ৮০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ রয়েছে। একই পরিস্থিতি নাভানা গ্রুপের রিয়েল এস্টেট, নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস, ফার্নিচার, খাদ্য, মেডিকেল ইকুইপমেন্ট, প্লাস্টিকসহ অন্যান্য খাতের বিনিয়োগেও।
ব্যবসায়িক দেউলিয়াত্ব থেকে বাঁচতে ২০১৯ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ে এক আবেদন করে নাভানা গ্রুপ। আবেদনে দেশের বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নেয়া শিল্প গ্রুপটির সব ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) কর্তৃক অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেয়া হয়। গ্রুপটির এ আবেদন মেনে নিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে লিখিত নির্দেশনাও দেয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ ব্যাংকও। গত দুই বছরে বিষয়টি নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নির্বাহীসহ সংশ্লিষ্টরা। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ঋণই অধিগ্রহণ চূড়ান্ত হয়নি। প্রাথমিকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) থেকে নাভানার নেয়া ৭৪৫ কোটি টাকার ঋণ অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। এর মধ্যে মূল ঋণ হলো ৬০০ কোটি টাকা। বাকি ১৪৫ কোটি টাকা অপরিশোধিত সুদ ও অন্যান্য ফি।
মূল ঋণের সুদ পরিশোধ করতে না পারলেও নাভানা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৪২৭ কোটি টাকা প্রণোদনার ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রধান চার ব্যাংক। করোনা মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ঘোষিত প্রণোদনার তহবিল থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে এ ঋণ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ফান্ডেড ঋণের বিপরীতে প্রণোদনা দেয়া হয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা। আর নন-ফান্ডেড ঋণের বিপরীতে ৯৭ কোটি টাকার প্রণোদনা ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। যদিও প্রণোদনা হিসেবে নেয়া ঋণের অর্থ কোন খাতে ব্যয় হয়েছে, তার কোনো হিসাব দিতে পারছে না নাভানা গ্রুপ। এ নিয়ে অস্বস্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি নাভানা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে ব্যাপক মাত্রায় রদবদল হয়েছে। পরিবর্তন এসেছে গ্রুপটির বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন পদেও। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে চাকরি করা পুরনো কর্মীদের চাকরিচ্যুতি চলছে। গ্রুপটির বিভিন্ন কোম্পানি বিক্রি করে দেয়ার আলাপ-আলোচনাও চলছে জোরেশোরে। সব মিলিয়ে জীবদ্দশায়ই নাভানার অস্তিত্ব বিলোপের সম্ভাবনা দেখছেন শিল্প গ্রুপটির স্বপ্নদ্রষ্টা শফিউল ইসলাম কামাল।
সামগ্রিক বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য বণিক বার্তার পক্ষ থেকে শফিউল ইসলাম কামালের সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কোনোভাবেই এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। সাইফুল ইসলাম সুমন ও সাজেদুল ইসলাম শুভ্ররও বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হয় বিভিন্ন মাধ্যমে। সেটিও সম্ভব হয়নি।
শফিউল ইসলাম কামাল দুই বছরের বেশি সময় ধরে নিজ বাসা থেকে বেরোননি। তিনি গুলশান-২-এর ৭১ নম্বর সড়কে নিজ বাসায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। তার ব্যবহূত সেলফোন নাম্বারটিও বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে কানাডায় বসবাস করছেন গ্রুপটির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম সুমন। তার সেলফোন নাম্বারটিও দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ। বিভিন্ন মাধ্যমে চেষ্টা করে আরেক ভাইস চেয়ারম্যান সাজেদুল ইসলাম শুভ্রর সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
শফিউল ইসলাম কামাল বা তার সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না গ্রুপটিকে ঋণ দেয়া বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরাও। অন্তত ১০টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বণিক বার্তাকে বলেছেন, ঋণ আদায়ের বিষয়ে কথা বলতে তারাও বিভিন্ন মাধ্যমে শফিউল ইসলাম কামাল বা তার সন্তানদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অনেক দিন থেকেই সেটি সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য তারা নাভানা গ্রুপের কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, শফিউল ইসলাম কামাল বা তার সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। গ্রুপটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমাদের শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগাযোগ আছে। তারা ঋণ আদায়ের বিষয়ে আলাপ করেন। নাভানা গ্রুপের কোম্পানিগুলো যে পরিস্থিতিতে পড়েছে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন।
শফিউল ইসলাম কামালের দীর্ঘদিনের গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত সহকারীরা বলছেন, করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে তারাও শফিউল ইসলাম কামাল বা তার সন্তানদের দেখা পাননি। তবে মাঝেমধ্যে অন্যের সেলফোনে শফিউল ইসলাম কামালের সঙ্গে কথা হয়েছে। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক ত্রুটি ছাড়া তার বড় কোনো অসুস্থতা নেই।
যদিও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নাভানা সিএনজি লিমিটেড ও আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারিরা বলছেন, ভার্চুয়াল মাধ্যমে শফিউল ইসলাম কামাল ও তার সন্তানরা কোম্পানির পর্ষদ সভাসহ বিভিন্ন সভায় যুক্ত হচ্ছেন। আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি জামাল খান বণিক বার্তাকে বলেন, কোম্পানির পর্ষদ সভায় চেয়ারম্যানসহ অন্য পরিচালকরা ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছেন। মহামারীর শুরু থেকেই এমনটি চলছে।
তবে তিনি কোম্পানির ব্যবসায়িক পরিস্থিতি সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না বলে মন্তব্য করেছেন।
প্রায় একই কথা বলেছেন নাভানা সিএনজি লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি নাফিস আহমেদ। তিনি বলেন, এটি ঠিক নাভানা সিএনজি ব্যবসায়িকভাবে কঠিন সময় পার করছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। শফিউল ইসলাম কামাল বাসা থেকে কোম্পানির পর্ষদ সভায় যুক্ত হচ্ছেন। আর সাইফুল ইসলাম সুমন যুক্ত হচ্ছেন কানাডা থেকে।
দেশের সফল উদ্যোক্তাদের পথিকৃৎ ভাবা হয় প্রয়াত জহুরুল ইসলামকে। কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থেকে শুরু করে উপমহাদেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে গিয়েছিল তার পরিচিতি। জহুরুল ইসলামের হাতে গড়ে উঠেছিল নির্মাণপ্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (বিডিসি)। জাতীয় সংসদ, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ ব্যাংক ভাবনসহ দেশের নান্দনিক বহু স্থাপনা গড়ে উঠেছে এ কোম্পানির হাত ধরে। আফতাব গ্রুপ, ইসলাম গ্রুপ, ইস্টার্ন হাউজিং, নাভানার মতো শিল্প গ্রুপের জন্ম হয়েছিল জহুরুল ইসলাম ও তার ভাইদের হাত ধরে।
১৯৯৫ সালে জহুরুল ইসলামের মৃত্যুর পর ভাইদের মধ্যে ভাগ হয় কোম্পানিগুলো। তার সন্তানরা হাল ধরেন ইসলাম গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি ইস্টার্ন হাউজিংয়ের। জহুরুল ইসলামের ভাই আজহারুল ইসলাম গড়ে তোলেন আফতাব গ্রুপ। অন্য ভাই শফিউল ইসলাম কামাল নাভানা গ্রুপের জন্ম দেন। উত্তরাধিকার হিসেবেই আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেড ভাগে পান তিনি।
১৯৯৬ সালে নাভানা শিল্প গ্রুপের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন শফিউল ইসলাম কামাল। এ গ্রুপের অধীনে জন্ম দেন দুই ডজনেরও বেশি কোম্পানি। অটোমোবাইল, শিল্প যন্ত্রাংশ, ব্যাটারি, রিয়েল এস্টেট, নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস, ফার্নিচার, খাদ্য, মেডিকেল ইকুইপমেন্ট, পেট্রোলিয়াম প্রডাক্ট, তেল, গ্যাস, প্লাস্টিক, নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে নাভানার। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করপোরেট সংস্কৃতি না থাকা, অভিজ্ঞতা নেই এমন খাতে বিনিয়োগ, অব্যবস্থাপনা, ব্যাংকঋণের অপব্যবহার ও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে নাভানার বিপর্যস্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
অথচ দেশের বাজারে জাপানের টয়োটা গাড়ি এসেছিল নাভানার হাত ধরে। এখনো আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডই বাংলাদেশে টয়োটা গাড়ি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান। ১৯৬৪ সাল থেকে জাপানের বিখ্যাত হিনো মোটরসের গাড়ি বিপণন করে আসছে আফতাব অটো। একসময় দেশের অভ্যন্তরে দূরপাল্লার গাড়ির ক্ষেত্রে হিনো মোটরসের গাড়িই ছিল প্রধান ভরসা।
এছাড়া শফিউল ইসলাম কামালের মালিকানাধীন নাভানা গ্রুপের অন্য কোম্পানিগুলো হলো নাভানা রিয়েল এস্টেট লিমিটেড, নাভানা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, নাভানা বিল্ডিং প্রডাক্ট লিমিটেড, নাভানা ফার্নিচার লিমিটেড, নাভানা ব্যাটারিজ লিমিটেড, নাভানা সিএনজি লিমিটেড, নাভানা লজিস্টিকস লিমিটেড, নাভানা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, নাভানা ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, নাভানা এলপিজি লিমিটেড, নাভানা ফুডস লিমিটেড (গ্লোরিয়া জিন্স কফি), নাভানা ওয়েল্ডিং ইলেকট্রেড লিমিটেড, মাহিন্দ্রা টু হুইলারস, টয়োটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকুইপমেন্ট, নাভানা রিনিউয়েবল এনার্জি লিমিটেড, নাভানা ডিজিটাল ইকুইপমেন্ট লিমিটেড, নাভানা ইন্টারলিংকস লিমিটেড, নাভানা বিপণন লিমিটেড ইত্যাদি।
নাভানা গ্রুপের এসব কোম্পানির নামে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ৮ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের বড় অংকের ঋণ আছে নাভানার কোম্পানিগুলোয়। এছাড়া বেসরকারি খাতের প্রাইম, ব্র্যাক, ঢাকা, মার্কেন্টাইল, দ্য সিটি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ওয়ান, এনসিসি, ট্রাস্ট, ডাচ্-বাংলা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, স্ট্যান্ডার্ড, এনআরবি কমার্শিয়াল, সাউথইস্ট, আল-আরাফাহ্ ইসলামী, আইএফআইসি, যমুনা, শাহ্জালাল ইসলামী, মেঘনা, মধুমতি, মিডল্যান্ড, এসবিএসি ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে নাভানা গ্রুপ। পিপলস লিজিং, বে লিজিং, জিএসপি ফাইন্যান্স, মাইডাস ফাইন্যান্সিং, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল, বিডি ফাইন্যান্স, ফিনিক্স ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, হজ ফাইন্যান্স কোম্পানিসহ বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) কাছেও প্রায় ৭৫০ কোটি টাকার ঋণ আছে নাভানার।
বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নাভানা গ্রুপের ঋণগুলো অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে লিড অ্যারেঞ্জারের ভূমিকা রাখছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহী মো. শামস-উল-ইসলাম এক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা রাখছেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, কিছুদিন আগে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ গর্মেন্টস প্রতিষ্ঠান ওপেক্স সিনহা বন্ধ হয়ে গেল। প্রতিষ্ঠাতার জীবদ্দশায়ই প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় দুঃসংবাদ। নাভানা গ্রুপও যে পরিস্থিতিতে পড়েছে, সেটি প্রত্যাশিত নয়। নাভানা একসময় দেশের ব্যবসায়ীদের পথ দেখিয়েছে। এখন কেন এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো নাভানার ঋণ অধিগ্রহণের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। তবে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বেশ কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, কয়েক বছর ধরেই নাভানার কোম্পানিগুলো নিবু নিবু করছে। এ দুঃসময়েও নাভানার উদ্যোক্তাদের জীবনাচারে কোনো পরিবর্তন আসেনি। নমনীয়তা না দেখিয়ে গ্রুপটির কাছ থেকে ব্যাংকঋণ আদায়ের জন্য কঠোর হওয়া দরকার।










