কভিডের কারণে গত বছর স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানির ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। তবে কভিড পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এ বছর কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিকদের মধ্যে একমাত্র রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশ ছাড়া আর বাকি কোম্পানিই এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য ব্যবসা প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ, বাটা সু ও হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের। অবশ্য বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে কিছু কোম্পানির ব্যবসা প্রবৃদ্ধি হলেও নিট মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত টেলিযোগাযোগ খাতের বহুজাতিক কোম্পানি গ্রামীণফোন লিমিটেড চলতি ২০২১ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ১০ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা আয় করেছে। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির আয় ছিল ১০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ। অবশ্য আয় বাড়লে এ সময়ে কোম্পানিটির ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা কিছুটা কমেছে।

তৃতীয় প্রান্তিকে আর্থিক ফলাফল সম্পর্কে গ্রামীণফোন লিমিটেডের সিইও ইয়াসির আজমান বলেন, এ সময়ে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও নতুন স্পেকট্রাম সংযুক্ত অব্যাহত রয়েছে। সেই সঙ্গে আমাদের বাজার পরিচালন পদ্ধতি ও গ্রাহকদের সুবিধা অনুযায়ী অফার প্রদানের ফলে গ্রাহকরা গ্রামীণফোনকে তাদের পছন্দের নেটওয়ার্ক হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। তৃতীয় প্রান্তিকে আমাদের নেটওয়ার্কে ২৪ লাখ ডাটা ব্যবহারকারী যুক্ত হয়েছেন। যার ফলে ডাটা ব্যবহারকারীর বছরপ্রতি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশে। পাশাপাশি গ্রাহকদের কাছে ভয়েস ও ডাটা বান্ডেল প্যাক নিয়ে আসার দিকে মনোনিবেশ করার মাধ্যমে আমরা গ্রাহকদের মধ্যে ভয়েস ব্যবহারকারী থেকে ডাটা ব্যবহারকারীতে রূপান্তরের উচ্চ হার লক্ষ্য করেছি। এ সময়ে ফোরজি ডাটা ব্যবহারকারী রূপান্তরের হার বছরপ্রতি ৫৫ শতাংশ বেড়েছে।

তালিকাভুক্ত সিমেন্ট খাতের বহুজাতিক কোম্পানি হাইডেলবার্গ সিমেন্টের ২০২১ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। যেখানে গত বছরের একই সময়ে বিক্রি ছিল ৮১০ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির বিক্রি বেড়েছে ৫৬ শতাংশ। ভালো ব্যবসা হওয়ার কারণে এ সময়ে কোম্পানিটির ৫৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়েছে। যেখানে গত বছরের একই সময়ে ১৭ কোটি টাকা লোকসান ছিল।

সিমেন্ট খাতের আরেক বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেড চলতি ২০২১ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে ভালো ব্যবসা করেছে। মূলত সিমেন্ট ও চুনাপাথর চিপের ব্যবসা থেকে ভালো আয় হওয়ার কারণে কোম্পানিটির বিক্রি বেড়েছে। প্রথম তিন প্রান্তিকে লাফার্জহোলসিমের বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে বিক্রি ছিল ১ হাজার ১৪২ কোটি টাকা। এ সময়ে আগের বছরের তুলনায় কোম্পানিটির বিক্রি বেড়েছে ৩৭ শতাংশ। পাশাপাশি এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফায় ১০৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত জ্বালানি খাতের বহুজাতিক কোম্পানি লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেড চলতি ২০২১ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে ভালো ব্যবসা করেছে। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় হয়েছে ৩৭৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা। যেখানে আগের হিসাব বছরের একই সময়ে আয় ছিল ৩৩৬ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৬১ শতাংশ। আয় বাড়ার কারণে চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা বেড়েছে ২৪ শতাংশ।

চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) এফএমসিজি খাতের বহুজাতিক কোম্পানি ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেডের আয় বেড়েছে ১৪ শতাংশ।  এ সময়ে কোম্পানিটির আয় হয়েছে ৬৭৫ কোটি টাকা। যেখানে আগের হিসাব বছরের একই সময়ে আয় ছিল ৫৯২ কোটি টাকা। আয়ের পাশাপাশি এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফাও বেড়েছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক ইলেকট্রনিক্স ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স উৎপাদক সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেড চলতি ২০২১ হিসাব বছরের তিন প্রান্তিকে ১ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা বিক্রি করেছে। যেখানে আগের হিসাব বছরের একই সময়ে বিক্রি ছিল ১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির বিক্রি বেড়েছে ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। তবে কভিডের প্রভাবে ঈদুল আজহার সময়ে প্রত্যাশিত হারে রেফ্রিজারেটর বিক্রি না হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ শতাংশ কমে প্রায় ৬০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

তালিকাভুক্ত বহুজাতিক জুতা উৎপাদক বাটা সু কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে ৫৪৩ কোটি টাকা আয় করেছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল ৩৪৪ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে প্রায় ৫৮ শতাংশ। কভিডের কারণে ব্যবসায় মন্দা হওয়ার কারণে গত বছর লোকসানে চলে গিয়েছিল কোম্পানিটি। এ বছর আয় বাড়ার প্রভাবে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট লোকসান কমে ১৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যেখানে গত বছরের একই সময়ে লোকসান ছিল ১২২ কোটি টাকা।

তামাক খাতের তালিকাভুক্ত বহুজাতিক ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি) লিমিটেডের চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে আয় হয়েছে ২৪ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। যেখানে আগের হিসাব বছরের একই সময়ে আয় ছিল ২০ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। আয় বাড়ার কারণে এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফায় ৩২ দশমিক ৫৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

তালিকাভুক্ত বহুজাতিক রঙ উৎপাদক বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের আয় চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে ৯৭৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৬১৩ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ৫৯ শতাংশ। আয়ের পাশাপাশি এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফাও বেড়েছে।

বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের আর্থিক ফলাফল সম্পর্কে জানতে চাইলে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) প্রেসিডেন্ট রূপালী চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, চলতি হিসাব বছরের প্রথম দুই প্রান্তিকে আমাদের ব্যবসা ও মুনাফায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি হলেও বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও জাহাজীকরণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওঠা-নামার কারণে পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেছে। এতে কোম্পানির নিট মুনাফা কমে গেছে। বাড়তি ব্যয় সমন্বয়ে প্রথম দফায় এ বছরের মে মাসে এবং দ্বিতীয় দফায় সেপ্টেম্বরের পর রঙের দাম বাড়ানো হয়েছে। তাই যদি সামনের প্রান্তিকগুলোতে ভোক্তা পর্যায়ে রঙের চাহিদা বাড়ে, তাহলে বার্জারের মুনাফার ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছি।

রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশ লিমিটেড চলতি ২০২১ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে ৩৮০ কোটি টাকা আয় করেছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৪০৩ কোটি টাকা। দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির কারণে গত বছর ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। এতে রেকিট বেনকিজার বাংলাদেশ গত বছর এসব পণ্য বিক্রি করে ভালো ব্যবসা করেছিল। তবে কভিড পরিস্থিতি বর্তমানে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসার কারণে এ বছর ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে চলতি ২০২১ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটির আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ কমে গেছে। অবশ্য ব্যবসা থেকে আয় কমলেও পরিচালন আয় কমার পাশাপাশি আড়াই শতাংশ হারে করপোরেট কর হ্রাসের প্রভাবে এ সময়ে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়েছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিরামিকস খাতের বহুজাতিক কোম্পানি আরএকে সিরামিকস (বাংলাদেশ) লিমিটেড চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে ৪৮৪ কোটি টাকা আয় করেছে। যেখানে এর আগের হিসাব বছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৩৪১ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। আয় বাড়ার কারণে এ সময়ে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ গুণ বেড়ে ৬৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের বহুজাতিক কোম্পানি ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের আয় চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে ৩১৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে আয় ছিল ২৭৭ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির আয় বেড়েছে ১৪ শতাংশ। ব্যবসা থেকে আয় বাড়লেও এ সময়ে কোম্পানিটির আর্থিক আয় কমে গেছে। মূলত এফডিআরের সুদহার কমে যাওয়ার কারণে তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটির আর্থিক আয় ১১ কোটি টাকা কমে গেছে। এতে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১৮ শতাংশ কমে ৩৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।