কুষ্টিয়ার
বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সবুজ ধানখেত। চলছে পরিচর্যা। কোথাও কোথাও ধানে শীষ বের হয়েছে। আর ক’দিন পর সে ধান
কৃষকের গোলায় ওঠার কথা। কিন্তু ফসলে হিট ইনজুরির শঙ্কা জাগিয়েছে প্রকৃতির বৈরী আবহাওয়া। তীব্র তাপে পুড়ে গিয়ে ধানে চিটা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ মুহূর্তে প্রচুর
সেচের প্রয়োজন হলেও ওই অঞ্চলের সেচ
প্রকল্প গঙ্গা-কপোতাক্ষ বা জিকের চার
পাম্পের মধ্যে বর্তমানে তিনটিই নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। পানি উত্তোলন করা হচ্ছে মাত্র একটি পাম্প দিয়ে। কোনো কারণে সেটিও নষ্ট হয়ে গেলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হবে বলে জানিয়েছেন কৃষক।
পদ্মার পানির ওপর নির্ভরশীল দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প জিকে চালু হয় ১৯৫৪ সালে। সেচ প্রকল্পটির প্রধান পয়েন্ট কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পানি সংরক্ষণ খাল। সেখান থেকে ঝিনাইদহ হয়ে মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর পানি সরবরাহের শেষ পয়েন্ট পর্যন্ত প্রধান খাল রয়েছে ১৯৪ কিলোমিটার। সেচ প্রকল্পের অধীনে রয়েছে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরার ১৩টি উপজেলা। প্রধান খালের বাইরে ৪৬৭ কিলোমিটার শাখা খাল ও ৯৯৫ কিলোমিটার প্রশাখা খাল রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় দুটি মৌসুমে চার জেলার ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়া হয়। পাশাপাশি জিকে সেচ প্রকল্পের প্রধান এবং শাখা খালগুলোয় পানি থাকলে সেচসুবিধাসহ আশপাশের টিউবওয়েল ও পুকুরে পানি স্বাভাবিক থাকে।
জিকে প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেচ নিয়ে প্রকল্পের আওতার কৃষক এখন বোরো ধানের পরিচর্যায় ব্যস্ত। চলতি তাপদাহে এ মুহূর্তে জিকের আওতায় বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি না থাকলেও হিট ইনজুরির পরবর্তী প্রভাব মোকাবেলায় বাড়তি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, দুটি বোরো মৌসুমের একটি শুরু হয় নভেম্বর (কার্তিক-অগ্রহায়ণ) মাসে। আর শেষটা হয় এপ্রিল-মে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ) মাসে। আর প্রতি বছর জানুয়ারির মধ্যভাগ থেকে শুরু হয় প্রকল্পের পানি সরবরাহ। চলতি বছর ১৫ জানুয়ারি সেচ পাম্প চালু করা হয়েছিল। সেখানে বর্তমানে পাম্প রয়েছে চারটি, যেগুলো ১০ মাস নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানো হয়। আর এ পাম্পগুলো একযোগে প্রতি সেকেন্ডে ১ হাজার ২০০ কিউসেক পানি সরবরাহ করতে সক্ষম।
সেচ প্রকল্পের পাম্প হাউজে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান যদিও বণিক বার্তাকে জানান, বর্তমানে প্রকল্পের পানি উত্তোলনের চারটির মধ্যে তিনটি পাম্পই বিকল। ফলে একটি পাম্প দিয়েই পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে জিকের ইনটেক চ্যানেলে পানি পাওয়া গেছে ৪ দশমিক ১ থেকে ৪ দশমিক ১৮ মিটার। তিনি আরো জানান, পাম্পে পানি আনতে পদ্মা নদী থেকে প্রায় ২ কিলোমিটারের একটি ইনটেক চ্যানেলের সহায়তা নিতে হয়। সে চ্যানেলে এ মুহূর্তে যথেষ্ট পানি রয়েছে। একটি পাম্প দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ কিউসেক পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, যা সুষম আকারে জিকের ১৯৪ কিলোমিটার খালে সরবরাহ করা হচ্ছে। এর বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় কৃষক পানির একাধিক বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে থাকে বলেও জানান এ প্রকৌশলী।
প্রকল্পের ধান বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশের ওপর দিয়ে চলমান দাবদাহ ধানের ক্ষতির কারণ হতে পারে। বোরো ধানের হিট ইনজুরি সহনীয় মাত্রা হলো ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বাতাসের সহনীয় আর্দ্রতার পরিমাণ ৩০ শতাংশ। কিন্তু এ মুহূর্তে সারা দেশেই প্রায় তাপমাত্র চলছে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে এবং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ প্রায় ৪৪ শতাংশ। মাত্র কয়েক ঘণ্টার এমন তাপমাত্রায় হিট ইনজুরির শিকার হতে পারে বোরো ধান। ২০২১ সালেও প্রায় অর্ধলাখ হেক্টর জমির ধান এ কারণে নষ্ট হয়ে যায়।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা আব্দুল আলিম সুমন জানান, দৌলতপুর উপজেলার বেশকিছু এলাকা নদীচরবর্তী হওয়ায় বোরো ধানে হিট ইনজুরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষত উপজেলার ফিলিপনগর, হোগলবাড়িয়া, আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের কিছু কিছু মাঠে পানি ঠিকমতো ধরে রাখা যাচ্ছে না। এলাকাগুলো নদীতীরবর্তী। এজন্য কৃষকের কিছু পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তারা বলছেন, হিট ইনজুরি মোকাবেলার প্রধান উপায় হচ্ছে জমিতে সবসময় ২-৩ ইঞ্চি পানি রাখতে হবে। এটা অব্যাহত রাখতে হবে বেশ কয়েকদিন। বিশেষত ধানের শীষে দানা শক্ত না হওয়া পর্যন্ত। পাশাপাশি পরাগায়ণ হওয়া ধানে বিকালবেলার দিকে পানির সঙ্গে নাইট্রোজেন সার, পটাশ বা জিংক মিশিয়ে স্প্রে করতেও বলা হচ্ছে কৃষকে।
জিকে সেচ প্রকল্পের আওতায় চাষ করেন খোকসা উপজেলার রমানাথপুর গ্রামের কৃষক জব্বার শেখ। ধান খেতে বর্তমানে প্রয়োজনীয় পানি পেলেও হিট ইনজুরির আশঙ্কা কাটাছে না তার। ভয় দূর করতে তাই নিয়মিত নাইট্রোজেন স্প্রে করছেন। রমানাথপুর মাঠের অনেক কৃষকই এমনটা করছেন বলে জানান জব্বার শেখ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. হায়াত মাহমুদ জানান, হিট ইনজুরির একমাত্র প্রতিরোধক হচ্ছে ধানগাছের গোড়া প্রয়োজনীয় পানিতে সবসময় ভিজিয়ে রাখা। তবে কুষ্টিয়াসহ আশপাশের কোনো কোনো এলাকায় পানির লেয়ার অতিরিক্ত নিচে নেমে যাওয়ায় সমতল স্তরের পানির অতিরিক্ত ডিহাইড্রেশন ঘটছে। আর এটা হলে গরম বাতাসের কারণে ধানের শীষ থেকে পানি বেরিয়ে যাবে। তার পরও অধিদপ্তরের মাঠ কর্মকর্তারা কৃষকের কাছে যাচ্ছেন। তাদের পরামর্শ দিচ্ছেন। জিকে সেচ প্রকল্পকেও যেকোনো মূল্যে পানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।










