বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেছেন, ‘কপি-পেস্ট নীতি দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। নীতিমালা তৈরির আগে দেশের বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপটে গবেষণা করতে হবে। নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা নিতে হবে। অন্য দেশের মডেল অন্ধভাবে অনুসরণ করলে তা শতভাগ কার্যকর হবে না। নিজেদের মানদণ্ড নিজেদেরই তৈরি করতে হবে, তবেই অর্থনীতি সত্যিকার অর্থে গতি পাবে। শুধু আইন করলেই পরিবর্তন আসে না। মানুষের আচরণ পরিবর্তন না হলে আইন কাগজেই থেকে যায়। যেমন আমরা দেখেছি, অনেক নামকরা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে ইটিপি যথাযথভাবে পরিচালিত হয় না। পরিবেশ রক্ষার আইন আছে, কিন্তু তার সঠিক বাস্তবায়ন নেই। কারণ—মানুষের আচরণে পরিবর্তন হয়নি।’

গতকাল বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাকক্ষে ‘ইন্টিগ্রেটিং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সার্কুলার ইকোনমি অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

ড. এ কে এনামুল হক বলেন, ‘আমাদের দেশে অসংখ্য রিসাইকেলিং উদ্যোগ রয়েছে, কিন্তু সেগুলো স্বীকৃত নয়। যেমন একটি বলপয়েন্ট কলমকে সাত ভাগে ভাগ করে রিসাইকেল করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের রিসাইকেল কোম্পানিগুলো যথাযথ স্বীকৃতি ও সহায়তা পায় না। তারা নষ্ট পণ্য আলাদা করে বিদেশে, বিশেষ করে চীনে রফতানি করছে। সেখানে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে নতুন পণ্য তৈরি করে চীন আবার আমাদের দেশেই রফতানি করছে। এটি আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদি আমরা নিজেদের রিসাইকেল ইন্ডাস্ট্রিকে স্বীকৃতি দিই, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও নীতিগত সুবিধা দিই, তাহলে পরিবেশ রক্ষা যেমন হবে, তেমনি অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজনও দেশে থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘এআই নিয়ে অযথা ভয়ের কিছু নেই। এআই মানুষের বিকল্প নয়—বরং একটি শক্তিশালী সহায়ক টুল। এটিকে শুধু ভাষা সংশোধন বা ছোটখাটো তথ্য জানার জন্য ব্যবহার না করে, গবেষণা, শিল্প উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনে কাজে লাগাতে হবে।’

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির অগ্রগতির জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের মহলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন স্নাতক সম্পন্ন করে নিজেদের দক্ষতা দেশের স্বার্থে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, সেজন্য শিক্ষা, নীতি ও শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। এতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সবাই ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে।’

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, ‘একসময় দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে শিক্ষিতদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই সীমিত। প্রথম প্রজন্মের শিক্ষিতরা ব্যবসায় এগিয়ে এলে তাদের সেভাবে গ্রহণ করা হতো না। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিও বদলাতে শুরু করে। দ্বিতীয় প্রজন্মের শিক্ষিত তরুণরা ব্যবসা খাতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে শুরু করেন। তারা আধুনিক শিক্ষা, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান নিয়ে শিল্প খাতে নতুন ধারা সৃষ্টি করেন।’

তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস ও সিরামিকসসহ বিভিন্ন শিল্প খাতে বাংলাদেশের শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। দক্ষ মানবসম্পদ, উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে এসব খাতে দেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

বিআইডিএসের গবিষণা পরিচালক ড. এসএম জুলফিকার আলী বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার্থীরা এক বিষয়ে পড়াশোনা করলেও চাকরি করছে অন্য খাতে। প্রযুক্তিগত শিক্ষা নিয়েও তারা সম্মানজনক কাজ পাচ্ছে না।’ বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা ও শিল্প খাতের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় আনতে সরকারের নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের (বিআইজিএম) অধ্যাপক মনিরুজ্জামান উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ তুলে ধরে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত পুরনো গাড়ি পড়ে থাকায় পরিবেশ দূষণ ও রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এসব থেকে কার্যকর রিসাইকেল উদ্যোগ নিতে হবে। অন্য দেশগুলো যেভাবে সার্কুলার ইকোনমি জোরদার করতে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে সফল পদক্ষেপ নিচ্ছে, বাংলাদেশকেও সে পথে এগোতে হবে।

সেমিনারে কি নোট উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দফতরের পরিচালক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শাহাব উদ্দিন। এতে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সার্কুলার ইকোনমি এবং সাসটেইনেবিলিটির আন্তঃসম্পর্ক ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর সম্ভাবনা তুলে ধরেন। উপস্থাপনার শুরুতে বৈশ্বিক পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ যেমন জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক দূষণ ও জীববৈচিত্র্য হ্রাসের বিষয়টি উল্লেখ করা হয় এবং টেকসই রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হয়।