সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবার ভোটাররা দুটি ব্যালট পেপারে ভোট দিয়েছেন। সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য সাদা ব্যালট ও গণভোটের জন্য ছিল গোলাপি ব্যালট। গতকাল সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। একটানা চলে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। সকালে দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বেড়ে যায়। যদিও ভিন্ন চিত্র ছিল গোপালগঞ্জের বেশির ভাগ কেন্দ্রে। ভোটারশূন্য ছিল জেলার অনেক কেন্দ্র। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ছিল বলে অভিমত ভোটার ও নির্বাচনসংশ্লিষ্টদের।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। বিগত তিনটি নির্বাচনে অনিয়ম এবং একতরফা ভোটের কারণে এবার তরুণ ভোটারদের একটা বড় অংশ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন। স্বাভাবিকভাবেই এ নির্বাচনে তরুণদের আগ্রহটা বেশি লক্ষ করা গেছে।
এবারই প্রথম ভোট দিয়েছেন রংপুর কারমাইকেল কলেজের অনার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা আন্নী। অটোরিকশাচালক আশিকুর রহমান আরিফও প্রথমবার ভোট দিয়েছেন। তাদের দুজনের বাড়ি নগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সেনপাড়া ও নিউসেন পাড়ায়। তারা দুজনই শিশুমঙ্গল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন।
সকালে ভোট দিয়ে আশিকুর রহমান বলেন, ‘এতদিন পরিবারের বড়দের ভোট দেয়ার কথা শুনেছি। কিন্তু আজকে আমি নিজে ভোট দিতে পেরে অনেক আনন্দিত।’
ভোট কেন্দ্র বাড়ির খুব কাছে হলেও বিকালে ভোট দিয়েছেন জাকিয়া সুলতানা আন্নী। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারে ৪০টির মতো ভোট। সবাই একসঙ্গে ভোট দিতে এসেছেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হয়েছে। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানকে অভিনন্দন।’
শুধু তরুণ নয়, বয়স্ক ভোটারদেরও উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। চট্টগ্রামের ওছিবা খাতুনের বয়স ১০৩ বছর ছুঁই ছুঁই। মিরসরাই পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের গোভনীয়া গ্রামের বাসিন্দা এই নারী চট্টগ্রাম-১ আসনের ভোটার। মিরসরাই সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে সকাল সাড়ে ৮টায় ভোট দিতে আসেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ওছিবাকে কেন্দ্রে নিয়ে আসেন তার নাতি।
কেন্দ্র থেকে বের হয়ে ওছিবা খাতুন বলেন, ‘আমার বয়স ১০৩ ছুঁই ছুঁই। একা হাঁটতে পারি না। আমার নাতি রিকশায় করে ভোট কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ভোট দিয়েছি। বয়স অনেক হয়েছে, হয়তো এটাই আমার শেষ ভোট।’
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বানীগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন ১১৫ বছর বয়সী ধর্মরাজ দে। তাকে ভোট কেন্দ্রে নিয়ে আসেন করুণ দে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ধর্মরাজ দের বয়স প্রায় ১১৫ বছর। তার বাড়ি বানীগ্রামের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে। কোনো রকম কথা বলতে পারলেও কানে কম শোনেন। তবে কারো সহায়তা ছাড়াই চলাচল করতে পারেন।’
ধর্মরাজ বলেন, ‘ভোট দিয়েছি। কেউ কিছু বলেনি আমাকে। আমার মতো করে ভোট দিয়েছি।’
ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, রংপুর, সিলেট বিভাগের বেশির ভাগ জেলায় উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। সকালে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের সরব উপস্থিতি নির্বাচনকে আরো প্রাণবন্ত করে তোলে।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারী উপজেলায় নির্বাচন নিয়ে কিছুটা শঙ্কা ছিল ভোটারদের মধ্যে। বিশেষ করে রাউজানের ভোট নিয়ে সবচেয়ে শঙ্কায় ছিলেন ভোটাররা। যদিও এসব উপজেলায় সকালে ভিড়, বিকালে ভোটার অনুপস্থিতিতে শেষ হয়েছে নির্বাচন।
রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজের মোট ভোটার সংখ্যা ৪ হাজার ২১৩ জন। বেলা আড়াইটা পর্যন্ত এ কেন্দ্রে ভোট পড়ে ১ হাজার ৯৯৩টি। পৌনে ৩টার পর কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি দেখা যায়নি। কিছুক্ষণ পর পর কয়েকজন ভোটারের উপস্থিতি দেখা গেলেও বাদবাকি সময়ে ভোটের হার কম ছিল বলে জানিয়েছেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা মো. শাহজাহাজ সিরাজ।
বরিশালেও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে ভোটগ্রহণ। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন।
রংপুরের ছয়টি আসনে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও সার্বিকভাবে ভোটের পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ। সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। প্রথম দিকে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে।
সিলেটেও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বিত টহল এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ও বডি ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি জোরদার ছিল।
সারা দেশে উৎসবের আমেজে ভোট হলেও ভিন্ন চিত্র ছিল গোপালগঞ্জে। সকাল থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হলেও বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল একদমই কম। তবে দুপুরের দিকে নারী ভোটাররা কেন্দ্রে আসেন।
সকাল সাড়ে ৭টার দিকে গোপালগঞ্জ সদর এলাকার কয়েকটি কেন্দ্রে গিয়ে ভোটারের তেমন উপস্থিতি দেখা যায়নি। সব কেন্দ্রের মাঠ ফাঁকা ছিল। ধীরে ধীরে ভোটার আসতে থাকেন। ৯টার পর টুঙ্গিপাড়া গিয়ে কিছু কেন্দ্রে ভোটার চোখে পড়লেও তা ছিল কম। এছাড়া দুপুরের দিকে কোটালীপাড়া উপজেলায় গিয়ে ভোটারের মোটামুটি উপস্থিতি দেখা যায়। তবে ভোট কেন্দ্রের মাঠে কোথাও তেমন লাইন ছিল না।










