রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাহাদুর শাহ পার্কে দোকান বরাদ্দ দিয়ে স্থানীয় ও পরিবেশকর্মীদের তোপের মুখে পড়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ধানমন্ডি লেকেও অতিবাণিজ্যিকীকরণ করায় লেকের পরিবেশ ও দর্শনার্থীদের চলাচল বিঘ্ন হচ্ছে। এ নিয়েও নগরবাসী ও সচেতন সমাজ ডিএসসিসির ব্যাপক সমালোচনা করছে। পুরান ঢাকার মানুষ রীতিমতো বাহাদুর শাহ পার্ক সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে যাচ্ছে। এর মধ্যেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) পাঁচটি পার্ক বাণিজ্যিকীকরণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাঁচটি পার্কের রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য ‘প্রস্তাব’ আহ্বান করেছে সংস্থাটি। সংস্থাটির পক্ষ থেকে পার্ক ও খেলার মাঠ রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলা হলেও সময়ের ব্যবধানে পার্ক ও মাঠের বৈশিষ্ট্য নষ্ট হয়ে এগুলো পুরোপুরি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে বলে আশঙ্কা নগর বিশ্লেষকদের।

ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নতুন নির্মিত ও সংস্কার করা পাঁচটি পার্ক ও খেলার মাঠ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের জন্য প্রস্তাব আকারে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পার্ক ও মাঠগুলো হলো শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক (গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক), বনানী রোড নং ২৭ পার্ক (কামাল আতাতুর্ক পার্ক), শহীদ যায়ান চৌধুরী মাঠ (চেয়ারম্যানবাড়ি খেলার মাঠ), বারিধারা পার্ক, বনানী ব্লক সি পার্ক।

ডিএনসিসি সূত্র জানিয়েছে, এসব মাঠ ও পার্কের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ডিএনসিসির একার পক্ষে সম্ভব নয়। লোকবল সংকট এক্ষেত্রে বড় বাধা। অর্থনৈতিক বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছেন কর্মকর্তারা। সবকিছু ভেবে বাণিজ্যিক পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। পার্ক ও মাঠ রক্ষায় বিকল্প কোনো ভাবনা আপাতত সিটি করপোরেশনের নেই উল্লেখ করে ডিএনসিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডিএনসিসি কয়েকটি পার্ক সংস্কার করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেছিল। কিন্তু বছর না ঘুরতেই সে পার্কগুলোর পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। পার্কের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতেই কর্তৃপক্ষ এখানে বাণিজ্যিক চিন্তা করছে।’

সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তকে মারাত্মক ভুল বলে মন্তব্য করেছেন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকায় পার্ক ও মাঠ রক্ষণাবেক্ষণের নামে বর্তমানে বিভিন্ন ক্লাব ও সংস্থা এগুলোর দখল কায়েম করেছে। সাধারণ মানুষের প্রবেশে নানাবিধ বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। পরিকল্পনা, আইন ও ন্যায্যতার দৃষ্টিতে এগুলোর বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে, এমন যেকোনো উদ্যোগই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এগুলো এলাকাবাসী ও সাধারণ জনগণের মাঠ। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে স্থানীয় কাউন্সিলর এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সমন্বয়ে পার্ক ও মাঠ রক্ষায় একটি কমিটি করে দেবেন। সে কমিটিই ঠিক করে দেবে এসব গণপরিসর রক্ষা ও ব্যবস্থাপনার জন্য কী করতে হবে। তারা যদি মনে করে এসব রক্ষণাবেক্ষণে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান বিলবোর্ড-বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই করা সম্ভব। অথবা অন্য কোনো উপায়েও সে ব্যয় ওঠানো যায়। যেমন ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্কে টাকার বিনিময়ে দোকান বরাদ্দ দিয়ে পার্কের পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু এলাকাবাসী বলছে, এ টাকা তারাই করপোরেশনের অ্যাকাউন্টে দিতে আগ্রহী। আসলে মানুষ পার্কে যায় সবুজ, নির্মল ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশের জন্য। সিটি করপোরেশনের কাজ এ গণপরিসরগুলোয় উদ্যান ও উন্মুক্ত স্থানের যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করা।’

পার্ক ও খেলার মাঠ রক্ষণাবেক্ষণকারী ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ১১টি বিষয় বিবেচনায় নেয়া হবে বলে জানিয়েছে ডিএনসিসি। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা, জনবল, আর্থিক সক্ষমতা, পার্ক পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ-সংক্রান্ত বাণিজ্যিক প্ল্যানও রয়েছে। এগুলো যাচাই শেষে নয়টি শর্তে পার্ক ও মাঠ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়া হবে। সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি এ দায়িত্ব পালন করতে পারবে। শর্তের মধ্যে রয়েছে জামানত হিসেবে ১০ লাখ টাকা ডিএনসিসির অ্যাকাউন্টে জমা রাখতে হবে, পার্কে প্রবেশের জন্য কোনো ফি নির্ধারণ করা যাবে না, পার্কের যাবতীয় ব্যয়সহ কোনো ক্ষেত্রেই সিটি করপোরেশনের আর্থিক কোনো সংশ্লেষ থাকবে না।

কাগজে-কলমে সিটি করপোরেশনের শর্তগুলো ভালো মনে হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যত্যয় হবে বলে মনে করছেন নগর বিশ্লেষকরা। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এসব শর্ত কোনোটিই আর শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয় না উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘পাবলিক স্পেস বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য নয়। পাবলিক স্পেস বা গণপরিসর হলো সাধারণ মানুষের নিজের মতো করে সময় কাটানোর জায়গা। এটা সিনেমা হল না যে এটাকে বাণিজ্যিক বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। গণপরিসরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে বাণিজ্যিক ব্যবহারের কারণে ওই এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা নানা সমস্যায় পড়ে।’

পার্ক ও মাঠ পরিচালনায় বিভিন্ন শর্তারোপ করা হলেও সেগুলো শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয় কিনা এটা করপোরেশনের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ বলে স্বীকার করেন ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূলত পার্ক দখলমুক্ত রাখার পাশাপাশি পার্কের পরিবেশ যেন সুন্দর থাকে সেজন্য আমরা প্রস্তাব আহ্বান করেছি। আমরা শর্ত দিয়েছি জনগণের যেন কোনো অসুবিধা না হয়। শর্তগুলো রক্ষা হবে কিনা সেটা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জের বিষয় তো বটেই। তবে এটা নিশ্চিত করে বলছি, জনগণের সুবিধাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব আমরা।’

গণপরিসরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন নগর গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘গণপরিসরগুলো রক্ষণাবেক্ষণ সিটি করপোরেশন সবসময় নিজস্ব অর্থায়নেই করত। হঠাৎ কী হলো ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বাহাদুর শাহ পার্কে দোকান বসিয়ে দিল। ধানমন্ডি লেকে দোকান বসিয়ে এমন বিশ্রী অবস্থা করেছে যে কোনো ভদ্র মানুষ সেখানে যাওয়ার পরিবেশ নেই। একই পথে যদি উত্তর সিটি করপোরেশনও হাঁটে তাহলে নগরবাসীর জন্য এটা উদ্বেগের বিষয়। আমাদের অনুরোধ, কোনোভাবেই যেন এ ভুল কর্তৃপক্ষ না করে।’