নড়াইলের বিলগুলোয় একসময় ছিল শামুকের প্রাচুর্য। বর্ষা ও শীত—দুই মৌসুমেই বিলের পানি, কাদামাটি ও জলজ উদ্ভিদের আশপাশে দেখা যেত অসংখ্য শামুক। জলজ পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীটি মাছ, হাঁসসহ বিভিন্ন জলজ ও পরিযায়ী পাখির অন্যতম খাদ্য। তবে কয়েক বছর ধরে বিপুল পরিমাণে আহরণের কারণে স্থানীয় জলাশয়গুলোয় এর উপস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।

শামুক কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে বিলের স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খলেও। কমছে বিভিন্ন পাখির খাদ্যের প্রাপ্যতা, পরিবর্তন হচ্ছে জলজ পরিবেশের ভারসাম্য। এতে মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পাখি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীর আবাসস্থলও হুমকিতে পড়ছে।

সরজমিনে দেখা গেছে, ভোর থেকেই নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ দলবদ্ধভাবে বিল থেকে শামুক সংগ্রহ করছে। বাদ যাচ্ছে না শিশুরাও। কেউ হাতে, কেউ ঝুড়ি বা বস্তা নিয়ে বিলের অগভীর পানি ও কাদামাটি থেকে শামুক তুলে নিচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, সংগ্রহ করা শামুকের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে বিক্রি হয়। আবার বড় একটি অংশ বিভিন্ন এলাকায় বাজারজাত করা হয়। শামুকের খোলস ও মাংস বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় এর চাহিদা রয়েছে। ফলে চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আহরণ।

নড়াইল সদরের সিংগাশোলপুরের বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘‌এক যুগ আগেও বিলে প্রচুর শামুক দেখা যেত। এখন আগের মতো আর দেখা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী প্রজন্ম হয়তো বিলের স্বাভাবিক পরিবেশে শামুক দেখতেই পাবে না।’ আরেক বাসিন্দা মিল্টন শেখ বলেন, ‘‌শামুক সংগ্রহের সময় ছোট শামুকও রেহাই পাচ্ছে না। প্রজননক্ষম হওয়ার আগেই সেগুলো তুলে নেয়ায় স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।’

নড়াইলের বিভিন্ন বিল শীত মৌসুমে পরিযায়ী পাখির অন্যতম বিচরণক্ষেত্র। স্থানীয়দের দাবি, আগের তুলনায় অনেক বিলেই পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমেছে। শামুক নিধনের ফলে খাদ্যের প্রাপ্যতা কমে যাওয়াও এর একটি কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

সেই সঙ্গে শামুক সংগ্রহের সময় বিলের তলদেশের কাদা ও পলি ব্যাপকভাবে নড়াচড়া করায় পানিতে অতিরিক্ত পলি ও জৈব পদার্থ মেশার আশঙ্কা থাকে। এতে পানির স্বচ্ছতা কমার পাশাপাশি তলদেশের ক্ষুদ্র জীব ও জলজ উদ্ভিদের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, অনেক স্থানে শামুক সংগ্রহের পর খোলস, মৃত শামুক ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলে রাখা হয়।

শামুক সংগ্রহকারীদের অনেকেই জানান, জীবিকার প্রয়োজনেই তারা এ কাজ করেন। অন্য কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় বিল থেকে শামুক সংগ্রহ করে বিক্রি করেই সংসার চালাতে হয় তাদের। পরিবেশকর্মীরা বলছেন, জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই শামুক আহরণে টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‌শামুক পানির ফিল্টার হিসেবে কাজ করে। পানির নিচের দূষিত পদার্থ পরিশোধনের মাধ্যমে মাছের বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে এটি ভূমিকা রাখে। তবে কিছু অসাধু মৎস্যচাষী নির্বিচারে শামুক নিধন করে মাছ ও চিংড়ির খাবারসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছেন। এতে প্রাকৃতিক পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৪৫০ প্রজাতির শামুক থাকলেও বিলাঞ্চলে সাধারণত আপেল শামুক বেশি পাওয়া যায়। এটি বাণিজ্যিকভাবেও মূল্যবান। তবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ-সংক্রান্ত আইনে কয়েকটি প্রজাতির শামুক সংরক্ষণের কথা থাকলেও আপেল শামুকের বিষয়ে সুস্পষ্ট উল্লেখ না থাকায় অতিরিক্ত আহরণ নিয়ন্ত্রণে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এদিকে ‘দেশীয় প্রজাতির মাছ এবং শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ১০ জেলার ৫২ উপজেলায় কয়েকটি শামুক প্রদর্শনী খামার স্থাপন করা হয়েছিল। প্রকৃতি থেকে শামুক বা শামুকের স্প্যাট সংগ্রহ করে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পুকুরে লালন-পালনের উদ্যোগ নেয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত প্রজনন ও বংশবিস্তার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাণিজ্যিকভাবে শামুক চাষের প্রযুক্তিও কার্যকর করা যায়নি।

দেশীয় প্রজাতির মাছ এবং শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো. খালিদুজ্জামানের মতে, বিভিন্ন বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে সরকারিভাবে শামুক সংরক্ষণ, আহরণ ও উত্তোলন নিষিদ্ধ করা হলে শামুকের বিস্তার বাড়ানো সম্ভব।