দেশের অন্যতম বড় অবকাঠামো মেট্রোরেল। ছয়টি রুটের মধ্যে প্রথম রুটটি উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চলাচল শুরু করেছে। শেষ গন্তব্য মতিঝিল পর্যন্ত এখন সচল হয়নি। তবে এরই মধ্যে দেশের প্রথম মেট্রোরেলের কল্যাণে উত্তরা ও মিরপুর এলাকার প্রপার্টির দাম বেড়েই চলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এক বছর আগেও উত্তরায় দেড় হাজার বর্গফুটের বেশি ফ্ল্যাট প্রতি বর্গফুট ১০ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মেট্রোরেলের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর একই আকৃতির ফ্ল্যাটের মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি বর্গফুট ১৩ হাজার টাকা। সামনের দিনগুলোয় এটা আরো বাড়বে বলেও মনে করছেন নগরবিদরা।

মিরপুর-১০-এর বাসিন্দা রাহাত ইসলাম। পেশায় সরকারি চাকরিজীবী। সম্প্রতি উত্তরা ১ নম্বর সেক্টরে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। ফ্ল্যাট কেনার অভিজ্ঞতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘করোনার আগে যে দামে ফ্ল্যাট পেয়েছিলাম, এখন তার চেয়ে অন্তত ১০ লাখ টাকা বেশি দিয়ে একই ফ্ল্যাট কিনতে হচ্ছে।’

মেট্রোরেলের প্রভাবে আগামী দিনগুলোয় ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্টের দাম আরো বাড়বে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মাকসুদ হাশেম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেকোনো এলাকায় বড় কোনো অবকাঠামো তৈরি হলে স্বাভাবিকভাবেই সেখানে জমি ও আবাসনের দাম বেড়ে যায়। মিরপুর ও উত্তরায় যেহেতু নতুন করে ভূমির ব্যবসা বড় করার সুযোগ নেই, তাই এখানে ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের দাম বাড়ছে। বিশেষ করে উত্তরা, দিয়াবাড়ি, মিরপুর ৬, ১০, ১১ ও ১২ নম্বরে প্রপার্টির দাম বাড়ছেই। এখন যে হারে বেড়েছে সামনের দিনগুলোতে এটা আরো বাড়বে।’

প্রপার্টির দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মেট্রোরেল কীভাবে প্রভাব ফেলেছে জানতে চাইলে এ নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘মেট্রোর কারণে যাতায়াত সহজ ও সময় সাশ্রয় হচ্ছে। ফলে এসব এলাকায় নতুন করে মানুষের আবাসনের আগ্রহ বেড়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি আছে এমন অনেকেও সময় বাঁচানোর জন্য মেট্রোতে যাতায়াত করবেন। এসব কারণে তাদের প্রথম পছন্দ থাকবে স্টেশন এলাকার আশপাশে ফ্ল্যাট কেনা কিংবা ভাড়ায় থাকা।’

উত্তরার বিভিন্ন সেক্টর ও মিরপুর এলাকার প্রপার্টির দাম বৃদ্ধির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমেছে। বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেডের (বিটিআই) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আগের চেয়ে ব্যাংকের গৃহ ঋণের সুদের পরিমাণ কমা সত্ত্বেও ওই সব এলাকায় ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির পরিমাণ কমেছে। বর্তমানে বাণিজ্যিক ঋণ ও গৃহ ঋণের সুদের হার প্রায় সমান, ৯ ও ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০১২ সালে গৃহ ঋণে সুদের হার ছিল ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। তখন ফ্ল্যাট ছিল ক্রেতার নাগালের মধ্যে। বর্তমান সুদহার অনুযায়ী ১ কোটি ২০ লাখ টাকার ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনতে গেলে ক্রেতাকে মূল ঋণের চেয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। এটা ধরা হয়েছে ২৫ বছরের কিস্তি হিসাব করে। এ হিসাবে ২০১২ সালে একই এলাকায় ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ সুদের পরও একটি ফ্ল্যাটের মূল্য দাঁড়াত প্রতি বর্গফুট ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকা। বর্তমানে ৯ শতাংশ সুদের পর একই এলাকায় একই আকৃতির একটি ফ্ল্যাটের মূল্য দাঁড়াচ্ছে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা প্রতি বর্গফুট।

উত্তরা ও মিরপুর এলাকায় ফ্ল্যাট ক্রেতাদের বড় অংশই মধ্যম আয়ের। যোগাযোগ সুবিধা বৃদ্ধির ফলে এখানে আশপাশের অনেক এলাকা থেকেই আরো মানুষ জড়ো হবে। বিশেষ করে মেট্রোরেলে যারা নিয়মিত যাতায়াত করবেন এমন মানুষই এসব এলাকায় আবাস গড়বেন। সেক্ষেত্রে ফ্ল্যাটের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসার ভাড়াও বেড়েছে এসব এলাকায়। উত্তরা ১ নম্বর সেক্টরে আটটি প্রজেক্ট নির্মাণাধীন। এর মধ্যে তিনটি প্রজেক্টের ১৭টি ফ্ল্যাটই বিক্রয়যোগ্য। কিন্তু বিক্রি হয়েছে মাত্র পাঁচটি। ৩ নম্বর সেক্টরে অন্তত ২২টি, ৫ নম্বর সেক্টরে আটটি, ৭ নম্বর সেক্টরে ২৬টি ও ৯ নম্বর সেক্টরে চারটি প্রজেক্ট নির্মাণাধীন রয়েছে। এসব প্রজেক্টের অনেকগুলো ফ্ল্যাট এখনো বিক্রয়যোগ্য হয়নি। কোথাও কোথাও বিক্রয়যোগ্য হলেও আশানুরূপ ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।

ফ্ল্যাটের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কেবল মেট্রোরেল নয়—রড, সিমেন্টসহ সব ধরনের উপকরণের দাম বৃদ্ধি বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন কাজল। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সবকিছুর দামই তো হু হু করে বাড়ছে। স্বাভাবিকভাবে ফ্ল্যাটের দাম, বাসা ভাড়া এগুলোও বাড়বে। সামনে আরো বাড়বে। এজন্য মেট্রোরেল এককভাবে প্রভাব ফেলেছে এমনটি বলা ঠিক হবে না।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, বসবাস ও চাকরির সুযোগের দিক দিয়ে উত্তরা একটি সম্ভাবনাময় এলাকা। সেখানে যেমন চাকরির সুযোগ আছে তেমনি মেট্রোরেলের কল্যাণে অল্প সময়ে মতিঝিলসহ অন্যান্য এলাকায় গিয়েও চাকরি করা সহজ। ফলে উত্তরায় বসবাসের চাহিদা দিন দিনই বাড়ছে। বিশেষ করে উত্তরা ১, ৩, ৫ ও ৭ নম্বর সেক্টর খুবই সম্ভাবনাময়। মেট্রোর মতো প্রজেক্টের কারণে এসব এলাকার কদর বেড়েছে। একইভাবে বেড়েছে মিরপুরের কদরও। তবে কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও সেনপাড়ায় মেট্রোরেলের স্টেশন থাকলেও সেখানে প্রপার্টির দাম তুলনামূলক বাড়েনি। এর কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) এক্ষেত্রে একটি ভূমিকা পালন করছে। ড্যাপে উত্তরা ও মিরপুরে বেশি ভবনের উচ্চতা দেয়া আছে। অন্যদিকে কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়ায় ভবনের উচ্চতা কম।

উত্তরা ও মিরপুরে প্রপার্টির দাম বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পৃথিবীর সব দেশেই বড় অবকাঠামোর পাশে প্রপার্টি ও জমির দাম বেড়ে যায়। এতে যেমন সুবিধা আছে, তেমনি আছে অসুবিধাও। অসুবিধা হলো স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায় এসব প্রপার্টি। আমরা মেট্রোরেলের স্টেশনকেন্দ্রিক অবকাঠামো নির্মাণের একটি নীতিমালা তৈরি করছি। যেখানে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য প্রণোদনার বিষয়ে বলা থাকবে।’

বড় অবকাঠামো নির্মাণের কারণে প্রপার্টির দাম বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার আগে থেকেই ভাবনায় নিয়ে প্রপার্টি মালিকদের থেকে বেটারমেন্ট ফি নেয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমনকি আমাদের আইনেও বলা আছে সরকার যদি কোথাও ভূমি উন্নয়ন করে তাহলে আশপাশে যেসব জমির মালিকরা লাভবান হবেন তাদের থেকে বেটারমেন্ট ফি নিয়ে ওই উন্নয়নকাজে ব্যয় করবে। কিন্তু মেট্রোরেলসহ দেশের কোনো উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের ক্ষেত্রে এ আইন মানা হচ্ছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জমির মালিকরা কোনো বিনিয়োগ না করেই লাভবান হয়ে যাচ্ছেন। অথচ সরকার কাউকে বিনা বিনিয়োগে লাভের সুযোগ করে দিতে পারে না। এটা অন্যায়। সরকার চাইলে এখনো বেটারমেন্ট ফি নিতে পারে। এটা নেয়া উচিতও।’