২০২১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, মধুমতীর তীরঘেঁষে গড়ে ওঠা এ উপজেলার জনসংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার ৪৮০ জন। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সেবার পরিধি বাড়াতে হাসপাতালটি ৫০-১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। তবে সে অনুপাতে বাড়েনি চিকিৎসকের সংখ্যা। পুরনো জনবল কাঠামো দিয়েই পরিচালনা করা হচ্ছে হাসপাতালের কার্যক্রম। এর মধ্যে ঠিকমতো আসেন না বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এতে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন টুঙ্গিপাড়াসহ আশপাশের আরো দুই উপজেলার রোগীরা।

হাসপাতালের তথ্য বলছে, ১০০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০টি কনসালট্যান্টের পদ রয়েছে। এছাড়া জুনিয়র কনসালট্যান্টের পদ রয়েছে ১১টি। সব মিলিয়ে চিকিৎসকের ২১ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন পাঁচজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট।

রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে পাঁচজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালট্যান্ট) থাকলেও নিয়মিত রোগী দেখেন না তারা। আসেন নিজেদের ইচ্ছামতো। রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিকের টেস্ট রিপোর্ট ছাড়া তারা দেখেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরজমিনে দেখা গেছে, বেলা ১১টা ২০ মিনিটে ২০৬ নম্বর কক্ষের শিশু চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালট্যান্ট) ডা. আমামা আক্তারের কক্ষটি ছিল তালাবদ্ধ। পরে তাকে মুঠোফোনে কল দিলে ১১টা ৫০ মিনিটে নিজের কক্ষে আসেন তিনি। গাইনি চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালট্যান্ট) ডা. শিপ্রা নন্দীর কক্ষটিও ছিল তালাবদ্ধ। কারণ সপ্তাহে দুদিন টুঙ্গিপাড়া হাসপাতালে আসেন তিনি। সে হিসাবে মাসে আটদিন এসে তুলছেন পুরো মাসের বেতন। চোখের চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালট্যান্ট) ডা. আবির মল্লিক হাসপাতালে ছিলেন না। আর জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেস্থেসিয়া) ডা. মো. শাহজাহানের পোস্টিং টুঙ্গিপাড়া হলেও তিনি সব সময় থাকেন মুকসুদপুর। তাই তাকেও পাওয়া যায়নি। তবে এসব বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানভীর আহমেদ অনিয়মিত চিকিৎসকদের পক্ষে সাফাই গেয়ে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতী গ্রামের রানা শেখ অভিযোগ করে বলেন, ‘গত রোববার সকালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পেয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। বসে থেকেও অর্থোপেডিক ডাক্তারের দেখা পাইনি। পরে গোপালগঞ্জ গিয়ে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অন্য অর্থোপেডিক ডাক্তার দেখিয়েছি। এতে সময় আর টাকা দুটোই অপচয় হয়েছে।’

চিকিৎসা নিতে আসা বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার কলাতলা গ্রামের আরাফাত হোসেন ও পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার সাচিয়া গ্রামের আবু আমের বলেন, ‘টুঙ্গিপাড়া হাসপাতাল আমাদের খুব কাছে। এখানে চিকিৎসকের সংখ্যা কম। তার পরও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়মিত আসেন না। আমাদের সঙ্গে চিকিৎসকরা দুর্ব্যবহার করেন। তাদের বলে দেয়া নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিকের রিপোর্ট ছাড়া দেখেন না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা নিয়মিত থাকেন না।’

দেরিতে হাসপাতালে আসার বিষয়ে অর্থোপেডিক চিকিৎসক ডা. কাজী করিম নেওয়াজ বলেন, ‘এক মাসও হয়নি এখানে যোগদান করেছি। বেতন-ভাতা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে আসতে একটু দেরি হয়েছে।’

এসব বিষয়ে প্রথমে চিকিৎসদের পক্ষে সাফাই গেয়ে পরে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানভীর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘অর্থোপেডিক চিকিৎসকের বাসা দূরে হওয়ায় আসতে একটু দেরি হয়। আর শিশু ও চক্ষু চিকিৎসক ছুটির আবেদন করেছেন।’ যদিও আবেদনের কোনো লিখিত কপি দেখাতে পারেননি তিনি।

জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) ডা. মো. শাহজাহানের মূল কর্মস্থল টুঙ্গিপাড়া হলেও আগের সিভিল সার্জনের নির্দেশে তিনি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে থাকেন, টুঙ্গিপাড়া আসেন না। এছাড়া অনিয়মিত চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা দেয়ার পর ঠিক না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন ডা. তানভীর আহমেদ।