নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের পর দেশে মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে ঘোষিত সাধারণ ছুটির স্থায়িত্বকাল ছিল দুই মাসের বেশি। এ সময় প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম। বন্ধ ছিল অফিস-আদালত, কল-কারখানা ও বিপণিবিতানসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এতে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের চাহিদা কমে যায়। আর চাহিদা কমে যাওয়ায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ কম কিনতে হয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি)। ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের বোঝাও কমেছে। অর্থবছরটির শেষভাগজুড়ে থাকা করোনার প্রভাবে বিপিডিবির লোকসান কমেছে ৯৫ শতাংশ।
বিপিডিবির আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট লোকসান হয়েছে ৯ কোটি টাকা, যেখানে এর আগের অর্থবছরে লোকসান ছিল ১৭৪ কোটি টাকা। যদিও এর আগের বছরগুলোয় প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ছিল আরো বেশি। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৮ হাজার ৩৫৪ কোটি, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ হাজার ৪৩৪ কোটি এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা লোকসান হয় বিপিডিবির।
লোকসানের বোঝা কমাতে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নিতে হচ্ছে সংস্থাটির। সর্বশেষ দুই অর্থবছরে আগের বছরগুলোর তুলনায় লোকসান কম হওয়ার অন্যতম কারণও সরকারের দেয়া ভর্তুকি। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছর ৭ হাজার ৪৩৯ কোটি ও ২০১৮-১৯ অর্থবছর ৭ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। তবে ২০১৭-১৮ অর্থবছর ভর্তুকি বাবদ ৯৫৬ কোটি টাকা দেয়া হলেও তা প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের তুলনায় ছিল সামান্য। এছাড়া এ সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে ডিজেল ও এইচএফওভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বেশি বিদ্যুৎ কিনতে হয় বিপিডিবির। পাশাপাশি ওই অর্থবছর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়ে গিয়েছিল। এসব কারণে গত পাঁচ বছরের মধ্যে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিপিডিবির লোকসান হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লোকসান কমলেও বিদ্যুতের চাহিদা না থাকায় অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বিপিডিবিকে গুনতে হচ্ছে বড় অংকের অর্থ। চুক্তি অনুযায়ী ১০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে এ বাবদ বছরে দিতে হয় প্রায় ৯০ কোটি টাকা। বিপিডিবি ২০১৮ সালে ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে অলস কেন্দ্রগুলোকে দিয়েছে ৬ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। পরের বছর এর পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা।
বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, নিজস্ব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির কোনো লোকসান হয় না। মূলত ডিজেল ও এইচএফওভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের আগে সরকারের পক্ষ থেকে বিপিডিবিকে স্বল্পসুদে ঋণ দেয়া হতো। বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে এতে প্রতিষ্ঠানটির অর্থ সংস্থান হলেও আর্থিক প্রতিবেদনে সেটি দায় হিসেবে দেখাতে হতো। ফলে ক্রমাগত লোকসানের কারণে একসময় বিপিডিবির আর্থিক অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। লোকসানের বোঝা কমাতে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) দ্বারস্থ হয়। শেষ পর্যন্ত বিইআরসির পরামর্শে দুই বছর ধরে সরকার বিপিডিবিকে ভর্তুকি দিচ্ছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির লোকসানও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এর আগে সরকারের কাছ থেকে সংস্থাটির নেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় অর্ধলক্ষ।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলছেন, খরচ কমাতে পারলেই লোকসান কমে। করোনার কারণে কিছু প্রভাব পড়তে পারে। যেহেতু বিদ্যুৎ খরচ কম হয়েছে সে কারণে একটা প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু এটাও হওয়ার কথা নয়, কারণ পিডিবির লাভ-লোকসানের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ নেয়ার জন্য যেটা বেশি খরচ হয় সেটা সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকি হিসেবে দেয়া হয়। সেটা প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে আসার কথা না। সম্প্রতি প্রশাসনিক কিছু পরিবর্তন এসেছে, হয়তো এ কারণেই লোকসান কমতে শুরু করেছে। এখন কোনোভাবেই অতিরিক্ত খরচ করতে দেয়া হচ্ছে না।
এদিকে, সরকারি-আধাসরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে বিপিডিবির বড় অংকের বকেয়া বিদ্যুৎ বিল। এসব বিল বছরের পর বছর অনাদায়ী থাকছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য বলছে, ছয় হাজার কোটি টাকা বকেয়া বিলের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ বিপিডিবির।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, লোকসান কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সেই অনুযায়ী কিছু ফল আমরা এরই মধ্যে পেয়েছি। তবে লোকসান কমার সুনির্দিষ্ট কারণ আগামী বছরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বলা সম্ভব হবে।
লোকসান কমাতে ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছরই ডিজেল ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনা কমিয়ে দিচ্ছে বিপিডিবি। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ উৎপাদন করেছিল। এর পরের দুই অর্থবছরে এটি বেড়ে প্রায় দ্বিগুণে উন্নীত হয়। এর মধ্যে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৭ দশমিক ২১ শতাংশ বিদ্যুৎ ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে এসেছে। দুই অর্থবছর ধরেই এ খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এর মধ্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে মাত্র দশমিক ১৯ শতাংশ বিদ্যুৎ এসেছে ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১৬ দশমিক ৬২ শতাংশ উৎপাদন করেছিল। এর পরের ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৭ দশমিক ৩১ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ এ খাত থেকে এসেছিল। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে এটি আরো কমে ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন কমলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ২৫ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৭ দশমিক ১৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অবশ্য এ সময়ে উৎপাদনের পাশাপাশি ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতাও কমেছে।
সরকারি, বেসরকারি, যৌথ উদ্যোগ ও আমদানি মিলিয়ে এ বছরের জুন শেষে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২০ হাজার ৩৮৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সরকারি ৪৮ শতাংশ, বেসরকারি খাত ৪৩ শতাংশ, যৌথ উদ্যোগ ৩ শতাংশ এবং আমদানি সক্ষমতা ৬ শতাংশ। গেল অর্থবছরে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট সবচেয়ে বেশি ১২ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ২০২৫ সাল নাগাদ আরো ২২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে বিপিডিবির। এর মধ্যে ১৫ হাজার ২৯৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার ৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। নতুন কেন্দ্র যোগ হওয়ার পাশাপাশি ২০২৫ সাল নাগাদ সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৫ হাজার ৫০১ মেগাওয়াট সক্ষমতার ৭০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হবে।
বিপিডিবির পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালের ৫ মে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ৪৬ টাকা। এরপর ২০১২ থেকে গত বছরের পয়লা জুন পর্যন্ত প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৬১ থেকে ৬৫ টাকার মধ্যে ছিল। আর ২০১১ সালে ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল প্রতি লিটার ৪২ টাকা। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০ টাকা। ২০১৫ সাল পর্যন্ত ফার্নেস অয়েলের দাম অপরিবর্তিত ছিল। অবশ্য ২০১৬ সাল থেকে ফার্নেস তেলের দাম কমে ৪২ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ কেনার পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এর আগের বছরের তুলনায় বিপিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ২ দশমিক ৪০ শতাংশ। আইপিপি কেন্দ্রগুলো থেকে এ সময়ে বিদ্যুৎ কেনার পরিমাণ বেড়েছে ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ। রেন্টাল কেন্দ্রগুলো থেকে এ সময়ে বিদ্যুৎ কেনার পরিমাণ কমেছে ৩৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। সরকারি কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনার পরিমাণ ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ কমলে ভারত থেকে আমদানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
জ্বালানির ওপরই ব্যয়ের বিষয়টি বেশি নির্ভরশীল উল্লেখ করে পাওয়ার সেলের ডিজি মোহাম্মদ হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র হলেই খরচ বাড়বে। যদি চাহিদা বাড়ে তাহলে বাধ্য হয়ে ওগুলোই সচল থাকবে। চাহিদার সঙ্গে কিছুটা সম্পর্কিত। চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কম উৎপাদন খরচে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হবে। ফুয়েল মিক্সটাকে করতে হবে সাসটেইনেবল। চাহিদা হয়তো কমেছে, যার প্রভাবে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালাতে হয়নি। যদিও এ চিত্র সাময়িক। তবে আমাদের লক্ষ্য সরকারের ভর্তুকি কমিয়ে আনা।










