ভোর রাতে বেজে ওঠে মোবাইল ফোনটি। সন্তানের যেকোনো সংবাদ জানতে প্রতি মুহূর্তের প্রতীক্ষায় থাকা তারেকুলের মা হন্তদন্ত হয়ে ফোনটি রিসিভ করেন। শঙ্কার মধ্যে ফোনটি রিসিভ করার পর অন্য প্রান্ত থেকে কথা বলেন জলদস্যুদের কবলে থাকা সন্তান। বাবাকে ফোন দিয়ে তারিকুল জানান, বাবা আমি মুক্ত। বাংলাদেশী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর থার্ড অফিসার ফরিদপুরের তারেকুল ইসলাম। ফোন রিসিভ করতেই প্রিয় সন্তান খুশির কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মা আমি মুক্তি পেয়েছি’। সন্তানের মুখে মুক্তির কথা শুনে ক্ষণিকের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যান মা। খুশিতে কেঁদেই ফেলেন। যেন এমন একটি ফোনের অপেক্ষাতেই ছিলেন মা। এরপর আনন্দের খবর সবাইকে জানিয়ে দেয়ার পালা।

এদিকে এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই ভারত মহাসাগরে সোমালীয় জলদস্যুদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া বাংলাদেশী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর থার্ড অফিসার ফরিদপুরের তারেকুল ইসলামের গ্রামের বাড়িতে আনন্দের জোয়ার বইছে।

রোববার (১৪ এপ্রিল) বিকালে তারেকুলের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার ছকড়িকান্দি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে সবাইকে হাসিখুশি দেখা যায়। খবর পেয়ে তারেকুলের বাড়িতে ছুটে এসেছেন আত্মীয়-স্বজনরা। আর প্রতি মুহূর্তে ছুটছেন প্রতিবেশীরা।

ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা হয় তারেকুলের পিতা দেলোয়ার হোসেন ও মা হাসিনা বেগমের সঙ্গে। সংবাদকর্মীদের দেখে তারাও বেশ উচ্ছ্বসিত। একদিন আগেও পিতা-মাতার মুখ ছিল মলিন। ছেলের মুক্তির খবরে মুখে হাসি ফুটেছে।

তারেকুলের বাবা দেলোয়ার হোসেন জানান, রোববার ভোর ৪টার দিকে তার ছেলে তারেকুল ফোনে মুক্তির খবর জানিয়েছে। তিনি বলেন, ‘তারা সোমালিয়া থেকে জাহাজে দুবাইয়ের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। ছেলের মুক্তির খবর পেয়ে সকালে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করেছি।’

তারেকুলের মা হাসিনা বেগম বলেন, ‘ছেলে মুক্তি পেয়েছে খবর পেয়ে কলিজা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। এ যেন নতুন করে জীবন ফিরে পেলাম। ছেলেকে ফিরে পেতে মসজিদে মিলাদ ও মানত করেছিলাম।’ সরকারসহ দেশবাসীর প্রতি তারা কৃতজ্ঞ বলেও জানান।

অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী মো. দেলোয়ার হোসেনের দুই ছেলে, এক মেয়ের মধ্যে সবার ছোট মো. তারেকুল ইসলাম। ছকড়িকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাস করে চলে যান ঢাকায়। সেখানে মিরপুরের ড. মো. শহীদুল্লাহ্ কলেজিয়েট স্কুল থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন। ২০১২ সালে ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমিতে। ২০১৪ সালে নটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে চাকরিতে যোগ দেন।

সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে যোগ দিয়েছিলেন ভারত মহাসাগরে সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবলে পড়া গোল্ডেন হক নামে বাংলাদেশী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর থার্ড অফিসার হিসেবে। পণবন্দি ২৩ নাবিকের মধ্যে ফরিদপুরের সন্তান তারেকুলও পণবন্দি হিসেবে জিম্মি ছিলেন। বাংলাদেশী জাহাজ এমভি আবদুল্লাহর থার্ড অফিসার তিনি।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর নাটোরের মেয়ে তৎকালীন মেডিকেলের ছাত্রী নুসরাত আক্তার জুথিকে বিয়ে করেন। বিবাহিত তারেকুল-জুথি দম্পতির এক বছর তিন মাস বয়সী তানজিহা নামে একটি মেয়ে রয়েছে।