ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ছিলেন নিতুন কুন্ডু। পুরো নাম নিত্য গোপাল কুন্ডু। শিক্ষা জীবনে পড়ার খরচ মিটিয়েছেন আঁকাআঁকির কাজ করে। ইচ্ছা ছিল নিজ বিদ্যাপীঠেই নিয়োজিত হবেন শিক্ষকতায়। স্নাতকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ায় সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়ার সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছিল। তার পরও পেশাজীবনের শুরুটা হয় মার্কিন একটি সংস্থায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় যোগ দেন মুজিবনগর সরকারের তথ্য ও প্রচার বিভাগে। সে সময় বিভাগটির ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেছেন। ‘সদা জাগ্রত বাংলার মুক্তিবাহিনী’—এই স্লোগান সম্বলিত পোস্টারটি তারই ডিজাইন করা। স্বাধীনতার পর নির্মাণ করেছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভাস্কর্য। তবে এক পর্যায়ে শিল্পী থেকে হয়ে ওঠেন উদ্যোক্তা। শিল্পীর সৃজনশীলতাকে কাজে লাগান আসবাব শিল্পে। এক পর্যায়ে তার হাতেই আধুনিক রূপ নেয় দেশের আসবাব শিল্প।
আশির দশকের মাঝামাঝি অটবি প্রাইভেট লিমিটেড গড়ে তোলেন নিতুন কুন্ডু। অটবি এখন দেশের আসবাব শিল্পের অন্যতম বড় ব্র্যান্ড। এ শিল্পে নিতুন কুন্ডুর ব্যবসায়িক যাত্রা সত্তরের দশকের শেষভাগে। ভাস্কর হিসেবে নাম করার কারণে নানা মহলে পরিচিত হয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ব্যক্তিগত পরিচয়গুলোর সূত্র ধরেই দেশের করপোরেট জগতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তাব্যক্তিদের ব্যবহার্য আসবাব বানানোর কাজও পেয়েছেন। সেখান থেকেই হয়ে উঠলেন আধুনিক আসবাব শিল্পের পথিকৃৎ।
যারা আসবাব শিল্পে নিতুন কুন্ডুর পথচলা দেখেছেন, তাদের ভাষ্যমতে, মূলত চারুকলায় শিক্ষকতার ইচ্ছাই সবচেয়ে বেশি ছিল তার। সে আশা অপূর্ণ থেকে যায়। নানা ধরনের সৃষ্টিশীল কাজে যুক্ত ছিলেন। শিক্ষকতার আশা যখন উবে গেল, ততদিনে তিনি সংসারী হয়েছেন। সংসারের পরিসরও বেড়েছে। যুক্ত হয়েছে সন্তানদের জীবন ও ভবিষ্যতের চিন্তাও। ওই ভাবনা থেকেই শিল্পোদ্যোক্তা হওয়ার পথে এগোলেন তিনি। শিল্পী সত্তার বদৌলতে নানা মহলে পরিচিতি ছিল। নিয়মিত আড্ডা হতো ঢাকা ক্লাবে। সে সূত্রে পরিচয় ঘটে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। যোগাযোগ স্থাপিত হয় করপোরেট জগতের সঙ্গে। ১৯৭৭ সালে প্রথমবারের মতো নিবন্ধিত হয় তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান। সে সময় অটবির নাম ছিল ‘দ্য ডিজাইনার্স’। পরে তা হয় ‘আর্ট-ইন-ক্রাফট’। সর্বশেষ ১৯৮৪ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘অটবি প্রাইভেট লিমিটেড’।
কারখানা স্থাপনে সরকারি পর্যায় থেকেও উৎসাহ পেয়েছিলেন নিতুন কুন্ডু। আশির দশকে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের উপযোগী পণ্য ছিল কম। সে সময় নিতুন কুন্ডুকে তার উদ্ভাবন নিয়ে এসব প্রদর্শনীতে অংশ নেয়ার জন্য বারবার তাগিদ দিয়েছে রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)।
আসবাব খাতে ফ্ল্যাটপ্যাক প্যাকেজিংয়ের মতো নতুন পদ্ধতির সূচনা নিতুন কুন্ডুর হাতেই। আসবাব নির্মাণের সনাতন পদ্ধতি হলো কাঠ কেটে একক উপাদান হিসেবে পূর্ণাঙ্গ আসবাব তৈরি করা। কিন্তু বৃহদায়তনে পৃথক উপাদান উৎপাদন ও তা সংযোজনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ আসবাব তৈরির পদ্ধতিটি অটবির অবদান। এতে করে আসবাব তৈরি থেকে শুরু করে পরিবহনসহ সবদিকেই ব্যয় কমে আসে। একই সঙ্গে আসে কাঠের পুনর্ব্যবহারেরও সুযোগ।
নিতুন কুন্ডুই প্রথম এ পদ্ধতিতে আসবাব তৈরির কারখানা স্থাপন করেন। শিল্পী হলেও প্রকৌশল ও যন্ত্র নিয়ে তার উৎসাহ ও আগ্রহ ছিল অনেক। এ নিয়ে বিস্তর পড়াশোনাও করেছেন।
সৃষ্টিশীলতা ও প্রকৌশলগত আগ্রহ থেকে বিভিন্ন পরীক্ষামূলক কাজের জন্য স্টুডিও নির্মাণ করেছিলেন নিতুন কুন্ডু। এতে একবার এক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। সেখানে এক বন্ধুর মাধ্যমে জাপানি একটি কোম্পানির ফার্নিচার তৈরির কাজ পান তিনি। সে সময় ধাতব উপকরণের চেয়ারে সৃষ্টিশীলতার প্রয়োগের সুযোগ ছিল কম। কিন্তু প্রতিকূলতাকেই আলিঙ্গন করলেন নিতুন কুন্ডু। তার ডিজাইন করা চেয়ার দেখে ওই জাপানি বন্ধুর খুব পছন্দ হয়। তারপর ধীরে ধীরে করপোরেট জগৎ থেকে দাপ্তরিক আসবাব তৈরির কাজগুলো আসতে শুরু করল।
সুযোগ লুফে নিলেন নিতুন কুন্ডু। প্রথম কারখানা স্থাপন হয় মিরপুরে। এরপর দ্বিতীয় কারখানা স্থাপন করেন ১৯৯৪ সালে। ৩ লাখ বর্গফুটের কারখানাটি দশতলা। এতে স্থাপন করা হয় আধুনিক যন্ত্র। বাজারে আসতে থাকে কারখানাটিতে তৈরি লেমিনেটেড বোর্ড, মাইল্ড স্টিল ফার্নিচর, চেয়ার, সোফা, প্লাস্টিক ফার্নিচার ইত্যাদি।
বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি সেলিম এইচ রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশে নিতুন কুন্ডু শুরু করার আগেও ফার্নিচার তৈরি হতো। বেশির ভাগই ছিল ছোটখাটো দোকান। দুই-একটা বড় দোকানও ছিল। কিন্তু নিতুন কুন্ডুই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি দেখিয়েছিলেন শুধু বাসাবাড়ি না, অফিসেও শিল্পসম্মত ফার্নিচার প্রয়োজন আছে। তিনিই প্রথম শিল্পসম্মত অফিস ফার্নিচার তৈরির উদ্যোগ নেন। সেটিও প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প স্থাপনের মাধ্যমেই। বাংলাদেশের আসবাব শিল্প স্থাপনের পথিকৃৎ অবশ্যই নিতুন কুন্ডু। আমরা বাকিরা তাকে অনুসরণ করেছি।
জানতে চাইলে অটবির সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাব্বির হাসান নাসির বণিক বার্তাকে বলেন, নিতুন কুন্ডু প্রথমত একজন উঁচু মানের শিল্পী, ভাস্কর। তিনি একজন বড় মাপের উদ্যোক্তা, আবিষ্কারক। আমার কাছে তিনি একজন উন্নত প্রকৌশলীও। বাংলাদেশের আধুনিক আসবাব নির্মাণকে শিল্পে রূপ দেয়ার জনক বা পথিকৃৎ তাকে বলা যেতে পারে। তার জীবদ্দশায় অটবির পরিচিতি মূলত অফিস ফার্নিচার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। পরে আবাসস্থলের আসবাবেও মনোযোগী হয় অটবি। আমি যোগদানের পরে রিটেইল মার্কেটের ব্যাপ্তি বেড়ে যায় অটবির।
অটবির অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল তার মৃত্যুর পরও। ২০০৬ সালে ৭১ বছর বয়সে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নিতুন কুন্ডু। ২০০৮ সালে সাভারে অটবির বৃহদায়তনের আরেকটি কারখানা গড়ে ওঠে। ৬ লাখ বর্গফুটের ওপর গড়ে তোলা হয় অটবির চতুর্থ ও পঞ্চম ইউনিট। ওই দুই ইউনিটে শুরু হয় কাঠের এবং পার্টিকেল বোর্ডের আসবাব, প্লাইউড, কাঠের দরজা, ফোম ও ম্যাট্রেস তৈরি। নিতুন কুন্ডুর মৃত্যুর পর ব্যবসার পরিসর বৃদ্ধিতে সাভারে কারখানা গড়ে তোলা হলেও অটবির প্রথম মূল কারখানাটি মিরপুরের। মূলত নিজস্ব অর্থায়নে গড়ে তোলা কারখানাটি নির্মাণে সহযোগিতা করেছিল পরিচিত একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। অগ্রণী ব্যাংকেরও সহযোগিতা নেয়া হয়েছিল।
বর্তমানে দেশের বাইরেও যাচ্ছে অটবির আসবাবপণ্য। সার্কভুক্ত প্রতিটি দেশেই বাজারজাত করা ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্যে অটবির বাজার রয়েছে। পার্শ্ববর্তী ভারতে অটবির পণ্য রফতানি হয় উল্লেখযোগ্য হারে। অটবির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নিতুন কুন্ডুর সন্তান অনিমেষ কুন্ডু বণিক বার্তাকে বলেন, স্থানীয় বাজারে ব্র্যান্ড হিসেবে অটবিকে পরিচিত করে গেছেন বাবা। আমার স্বপ্ন অটবির এই পরিচিতি বৈশ্বিক অঙ্গনে ছড়িয়ে দেয়া।










