টঙ্গী নদীবন্দর থেকে ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথে আবারো চালু হয়েছে স্পিডবোট সার্ভিস। বেসরকারিভাবে চালু হওয়া এ সার্ভিসে প্রাথমিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে মোট পাঁচটি স্পিডবোট। চাহিদার ওপর ভিত্তি করে বাহনের সংখ্যা বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তবে কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়াই পথটি চালু করা হয়েছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তুরাগের শিল্পবর্জ্যের কারণে স্পিডবোট চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে। যার কারণে এ উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

গতকাল নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল টঙ্গী নদীবন্দরে বেসরকারি উদ্যোগ ইনফিনিটি মেরিটাইমের নতুন স্পিডবোট সার্ভিসের উদ্বোধন করেন। প্রথম পর্যায়ে টঙ্গী-আবদুল্লাহপুর-কড্ডা এবং টঙ্গী-আবদুল্লাহপুর-উলুখোলা রুটে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্পিডবোট চলাচল করবে। টঙ্গী-আবদুল্লাহপুর-কড্ডা রুটে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫০ টাকা। এ পথে সময় লাগবে ২৫ মিনিট। টঙ্গী-আবদুল্লাহপুর-উলুখোলা রুটের ভাড়া ১২০ টাকা, সময় লাগবে ১৯ মিনিট। পর্যায়ক্রমে যাত্রীদের চাহিদার ভিত্তিতে কড্ডা-গাবতলী ও গাবতলী-সদরঘাট নৌরুটে স্পিডবোট চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীবেষ্টিত ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার পথে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করতে বিপুল বিনিয়োগ করেছিল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে মোট চারবার পথটি সচলের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অভাব, পরিচালনায় অদক্ষতাসহ নানা কারণে বারবারই মুখ থুবড়ে পড়ে কার্যক্রম।

শুরু থেকেই এ রুটে বেসরকারি বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে এসেছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। অবশেষে বেসরকারি বিনিয়োগের দেখা পেল বৃত্তাকার নৌপথ। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আরো একবার কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়াই নৌপথটি সচল করা হলো। বিশেষ করে এ পথ চালুর আগে তুরাগ নদের শিল্পবর্জ্যের কথা মাথায় রাখা উচিত ছিল। কারণ নৌপথটিতে বর্জ্যের কারণে নৌযান চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়। সেটির সংস্কার না করে চালু করে দিলে শুরুতেই হোঁচট খেতে পারে বহুল প্রত্যাশিত উদ্যোগটি।

নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য সচিব ও নৌপথ গবেষক আমিনুর রসুল বাবুল বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা সবসময়ই চেয়েছি রাজধানীর বৃত্তাকার পথটি সচল থাকুক। কিন্তু এ পথের ব্যাপারে বারবারই সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার ঘাটতি দেখা গিয়েছে। এবার যখন প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিনিয়োগ এল, তখনো একই অবস্থাই দেখা গেল। কোনো রকম সমীক্ষা ছাড়াই এখানে স্পিডবোট চালু করে দেয়া হয়েছে। এটি একেবারেই দায়সারা কাজ। কারণ দূষণে বিপর্যস্ত তুরাগ দিয়ে স্পিডবোট চলতে পারবে কিনা, তার কোনো পরীক্ষাই করা হয়নি। বিআইডব্লিউটিএর এ ধরনের দায়সারা উদ্যোগের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলন।

আমিনুর রসুল আরো বলেন, শিল্পবর্জ্যের কারণে তুরাগে ট্রলার চালানোই মুশকিল। শুষ্ক মৌসুমে পানি আরো নিচে নেমে যাবে। তখন পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যাবে। কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়া তুরাগে এ ধরনের প্রকল্প শুরু করা বিআইডব্লিউটিএর উচিত হয়নি।

ইনফিনিটি মেরিটাইম বলছে, রাজধানীর বৃত্তাকার নৌপথে স্পিডবোট চালুর ফলে রাজধানীর সড়কপথে যানজট কমে আসবে। ২ ঘণ্টার পথ ২০ মিনিটেই পাড়ি দেয়া সম্ভব হবে। ফলে যাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠবে স্পিডবোট সেবা। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মিঞা ভাই বণিক বার্তাকে জানান, মূলত মাওয়া রুটে চলত তাদের এসব স্পিডবোট। পদ্মা সেতু চালুর ফলে তারা যাত্রীশূন্য হয়ে পড়েন। তখনই রাজধানীর বৃত্তাকার পথে স্পিডবোট চালানোর কথা মাথায় আসে। কারণ এতে যাত্রীদেরও উপকার হবে, ব্যবসাও প্রাণ ফিরে পাবে।

নৌপথের দূষণের বিষয়ে তিনি বলেন, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না তুরাগের শিল্পবর্জ্যের কারণে আমাদের বোট চলাচল বিঘ্ন হবে। গতকালই ইঞ্জিনে পলিথিন পেঁচিয়ে একটি বোট নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তবে বিআইডব্লিউটিএ আমাদের বলেছে, নাব্যতা স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং করা হবে। যদি বিআইডব্লিউটিএ সহযোগিতা করে, তাহলে এ পথে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়বে। আরো অনেকেই বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। আর যদি ইনফিনিটি মেরিটাইম লোকসান করে, তাহলে হয়তো এ পথে আর কেউ বেসরকারি উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন না।

সমীক্ষা ছাড়া নৌপথে স্পিডবোট চালানোর বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক বণিক বার্তাকে বলেন, এখন বর্ষা মৌসুমে এ পথ স্পিডবোট চলার পক্ষে উপযোগী। তবে শুষ্ক মৌসুমের জন্য আমরা সেখানে ড্রেজিং প্রকল্প হাতে নিয়েছি। আশা করছি কোনো সমস্যা হবে না।

উল্লেখ্য, ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার নৌপথের মোট দৈর্ঘ্য ১১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে সদরঘাট-আশুলিয়া পথের দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার, আশুলিয়া-টঙ্গী-কাঁচপুরের ৪০ কিলোমিটার এবং কাঁচপুর-নারায়ণগঞ্জ-সদরঘাট রুটের দৈর্ঘ্য ৪০ কিলোমিটার।

রাজধানীবাসীর চলাচলের সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯৯ সালে প্রথম বৃত্তাকার নৌপথ চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০০২ সালে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘ঢাকা শহরের চারদিকে নৌপথ চালুকরণ, যানজট নিরসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয়। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে সদরঘাট-আশুলিয়া পথের কাজ শেষ হয়। দ্বিতীয় পর্বে পরের বছর আশুলিয়া সেতু-টঙ্গী-কাঁচপুর রুটের কাজ শুরু হয়। ২০১২ সালের মধ্যে এ কাজ শেষ না হওয়ায় তা আরো বাড়ানো হয়। শুরুতে এ পথের বেশ সুফল মিললেও নদী ভরাট, নাব্য সংকট, রক্ষণাবেক্ষণের সংকটসহ নানা কারণে বন্ধ হয়ে যায় এসব। সব মিলিয়ে এর আগে পর্যন্ত চারবার এ রুট চালু করেও তা চলমান রাখা যায়নি। এর মধ্যে এবারই প্রথম বেসরকারি উদ্যোগে চালু হলো নৌযান সার্ভিস।