ঢাকায় আন্তঃজেলা বাস থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৬ হাজার ট্রিপ তৈরি হয়। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে ছয় হাজার ট্রিপ হয় বিদ্যমান তিন আন্তঃজেলা টার্মিনাল থেকে। বাকি ৬০ শতাংশই বা সাড়ে নয় হাজার ট্রিপ হয় রাজধানীর ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাউন্টারগুলো থেকে। ঢাকার যানজট ও পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলার জন্য এসব কাউন্টার অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা শহর কর্তৃপক্ষও চাইছে কাউন্টারগুলো শহরের বাইরে সরিয়ে দিতে। আগামী ২ মে থেকে পর্যায়ক্রমে শহরের ভেতরে থাকা কাউন্টারগুলো সরিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র। যদিও এখনই ‘ঢাকা’ ছাড়তে রাজি নন বাস মালিকরা। নগরীর উপকণ্ঠগুলোতে নির্মাণাধীন ও পরিকল্পনাধীন টার্মিনালগুলো তৈরি হওয়ার পর কাউন্টার স্থানান্তরের দাবি তাদের।

ধারণক্ষমতার দিক দিয়ে রাজধানীর সবচেয়ে বড় আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল গাবতলী। এটিতে একসঙ্গে ৪০০ বাস রাখা যায়। ২২ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা এ বাস টার্মিনাল দিয়ে প্রতিদিন ৪০ হাজার যাত্রী বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করে বলে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) এক গবেষণায় উঠে এসেছে। সেখানে বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির টিকিট কাউন্টার রয়েছে ২৪০টি।

আয়তনে ঢাকার দ্বিতীয় বৃহৎ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সায়েদাবাদ। ১০ একর জায়গার ওপর নির্মিত এ টার্মিনালের বাস ধারণক্ষমতা ২০০টি। যদিও প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার যাত্রী এ টার্মিনাল ব্যবহার করে। মোট টিকিট কাউন্টার রয়েছে ১০৮টি। অন্যদিকে ৯ একর জায়গার ওপর গড়ে ওঠা মহাখালী আন্তঃজেলা টার্মিনালের ধারণক্ষমতা ২০০ বাসের। প্রতিদিন এ টার্মিনাল ব্যবহার করে গড়ে ২৫ হাজার যাত্রী। মহাখালী টার্মিনালে বাস কাউন্টার আছে ৪০টি।

আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলোকে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী, কেরানীগঞ্জের বাঘাইর, নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর, তুরাগের ভাটুলিয়া, রূপগঞ্জের ভুলতা ও সাভারের হেমায়েতপুরে নতুন বাস টার্মিনাল তৈরি করা হবে। এজন্য একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিস্তারিত নকশার কাজ করেছে ডিটিসিএ। সংস্থাটির করা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ৪০ শতাংশ আন্তঃজেলা বাস বিদ্যমান তিন টার্মিনাল ব্যবহার করে। বাকি ৬০ শতাংশ বাস শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে পরিচালিত হয়। ঢাকার রাজারবাগ, আরামবাগ, ফকিরাপুল, গোলাপবাগ, বাড্ডা, মালিবাগ, চট্টগ্রাম রোড, কুড়িল বিশ্ব রোড, পান্থপথ, কলাবাগান, আসাদগেট, শ্যামলী, কল্যাণপুর, টেকনিক্যাল, মিরপুর-১ নম্বর এলাকা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব বাস চলাচল করে। এগুলোই শহরের ভেতরে যানজট ও সড়কে বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বুয়েটের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পৃথিবীর উন্নত শহরগুলোর কোথাও আন্তঃজেলা বাস শহরের ভেতরে প্রবেশ করে না। এসব বাসের টার্মিনালও থাকে শহরের বাইরে। তবে সেই টার্মিনাল ব্যবহার করা যাত্রীরা যেন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে সহজেই পৌঁছতে পারে, সেজন্য রিং রোড, বাইপাস রোডের মতো ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঢাকার চিত্রটি ঠিক উল্টো। এখানে শহরের ভেতরেই তিনটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল। আবার আন্তঃজেলা বাসের একটা বড় অংশই পরিচালিত হয় টার্মিনালের বাইরে বিভিন্ন সড়কের ধার থেকে। এগুলো যানজট ও পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা দুটোই বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

সরকার চাইছে, শহরের ভেতরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কাউন্টারগুলো পর্যায়ক্রমে রাজধানীর উপকণ্ঠে নির্মাণাধীন ও পরিকল্পনাধীন বাস টার্মিনালগুলোতে সরিয়ে নিতে। এ নিয়ে গত বুধবার পরিবহন মালিকদের সঙ্গে একটি সমন্বয় সভা করেছেন ঢাকার দুই মেয়র। সভা শেষে ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস জানান, যেখানে-সেখানে কাউন্টার এবং সেই কাউন্টার ঘিরে রাস্তার ওপর গাড়ি রেখে যানজট সৃষ্টি করতে দেয়া হবে না। শহরের বাইরে কাঁচপুরে একটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল তৈরি করা হচ্ছে। সায়েদাবাদ টার্মিনালের আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। আগামী মে মাসের মধ্যেই কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চলের বাস কাউন্টারগুলো শহর থেকে সরিয়ে দেয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। মেয়র তাপস এও জানান, আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কাউন্টারগুলোও সরিয়ে দেয়া হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে ঢাকার সব কাউন্টারই সরিয়ে নেয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

রাজধানীর যানজট কমাতে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে নিতে কার্যক্রম শুরু করার কথা জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলামও। পাশাপাশি শহরের ভেতরে থাকা বিভিন্ন বাস কোম্পানির কাউন্টারগুলোও তিনি সরিয়ে দেয়ার কথা জানিয়েছেন। যদিও কাউন্টার স্থানান্তরে অনীহা প্রকাশ করেছেন বাস মালিকরা। বাস কাউন্টারগুলো এখনই সরিয়ে না নেয়ার জন্য তারা এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছেন। এ বিষয়ে বাস মালিকরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শহরের ভেতরে থাকা কাউন্টারগুলো সরিয়ে নিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এসব কাউন্টার সরিয়ে নেয়ার আগে টার্মিনালগুলো প্রস্তুত হওয়াটা জরুরি। আমরা বলেছি, আগে অবকাঠামোগুলো তৈরি হোক, তারপর আমরা যাব। যেখানে যেখানে অবকাঠামো তৈরি হবে, আমরা সেখানেই চলে যাব।’