দেশে জ্বালানি সংকটের পেছনে কাঠামোগত সমস্যা আছে। এর মাঝে আবার অসম চুক্তি করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। জ্বালানি খাতের দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে এসব চুক্তি বাতিল করা দরকার। একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানিতে স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে।
আজ রোববার রাজধানীর এক পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা। ‘ন্যাভিগেটিং দ্য এনার্জি ট্রানজিশন: ফরেন পলিসি অ্যালাইনমেন্ট অ্যান্ড জিওপলিটিক্যাল রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ইনস্টিটিউট অব পলিসি গভর্ন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফর ডেভেলপমেন্ট ( আইপিজিএডি)।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন যুক্তরাজ্যের স্কুল অব অরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (এসওএস) বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক অধ্যাপক ড. মুশতাক খান। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতের সংকটকে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা দরকার। একটি হলো জ্বালানি সরবরাহের স্বল্পমেয়াদি সমস্যা, আর অন্যটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত ও উৎপাদন সংকট। আওয়ামী সরকারের আমলে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কাগজে-কলমে বেড়েছে চার গুণ। কিন্তু বাস্তবে আমাদের খরচ বেড়েছে ১১ গুণ এবং ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে ২০ গুণ। এটি কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্রভাড়া লুট করার লোভেই এমন অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যেখানে জ্বালানি সরবরাহের কোনো ব্যবস্থাই নেই।
বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মানসুরা আলম বলেন, আমাদের বিদ্যুৎ খাত এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এতদিন আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল কেবল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু এখনকার চ্যালেঞ্জ একেবারেই ভিন্ন। এখন আমাদের ভাবতে হবে কীভাবে টেকসই, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে শক্তির উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়। আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির দামের ওঠানামা অর্থনীতিতে যে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়, তা থেকে বাঁচতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। সঠিক নীতি প্রণয়ন ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমেই কেবল জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জন করা সম্ভব।
জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ বেসরকারিকরণ করা হলে সংকট সমাধান হবে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানা। তিনি বলেন, আমাদের স্বদেশীয় সম্পদ ব্যবহার করছি না আমরা। দেশের অভ্যন্তরে কূপ খনন না করে আমরা বিদেশীদের সঙ্গে চুক্তি করছি। এর ফলে আদতে দেশ ও জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক বলেন, আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিদেশী অলিগার্ক বা লুটেরাদের হাতে জিম্মি করা হয়েছে। আদানির মতো কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক চুক্তি ছিল না। বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে সেই বাড়তি টাকা দিয়ে একটি বিশেষ দেশের সমর্থন কেনা হয়েছে। এটি কেবল দুর্নীতি নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি সুস্পষ্ট হুমকি।
জ্বালানির উৎস বৈচিত্রায়ন করা দরকার বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) রিসার্চ ফেলো লাম-ইয়া মোস্তাক। তিনি বলেন, জ্বালানি এখন আর কেবল একটি অর্থনৈতিক পণ্য নয়, এটি একটি কৌশলগত সম্পদ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্ববাসী এটি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। হরমুজের ওপর ওপর অতি-নির্ভরশীলতা আমাদের অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। আমদানি নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে হবে। তবে সেজন্য শুধু সোলার প্যানেল আমদানি করলেই হবে না, নিজেদের দেশে উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। তা না হলে এক সংকটের বদলে আমরা আরেক সংকটের ফাঁদে পড়ব।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় ও উদ্যোক্তা অনুষদের সহযোগী ডিন অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, নীতি নির্ধারকরা যদি আইন ও অর্থনীতির সমন্বয় না বোঝেন, তবে বিপদ অনিবার্য। দেশের অর্থনীতি অসাধু ব্যবসায়ী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা মারাত্মকভাবে শোষিত হয়েছে। প্রতিযোগিতা কমিশনের ব্যর্থতার কারণেও সর্বত্র সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন আইপিজিএডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা হোসেন। তিনি বলেন, কারিগরি সমাধানের পাশাপাশি একটি বলিষ্ঠ রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরা সম্ভব নয়। নিজস্ব সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও স্বচ্ছ জবাবদিহির মাধ্যমেই বাংলাদেশ একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।










