প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন করা প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে যশোর শহরের ভৈরব নদের তীরে দেড় কিলোমিটার সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের কাজ দুই দফা মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ হয়নি। ফলে প্রকল্পটির সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শহরবাসী। দুই দফা মেয়াদে অগ্রগতি হয়েছে ৮০ শতাংশ। সর্বশেষ মেয়াদ বৃদ্ধির পর চলতি বছরের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা থাকলেও শেষ হয়নি। বাকি ২০ শতাংশ কাজ শেষ করতে সময় বৃদ্ধি ও ১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব পাঠিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

ভৈরব বাঁচাও আন্দোলন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ‘ভৈরব নদ সংস্কারের প্রথম থেকেই স্বেচ্ছাচারিতা চলছে। নদ খননকাজ শেষ হলেও দুই ধারের দখলদাররা রয়ে গেছে। নদী তট আইন মানা হয়নি। এরপর সৌন্দর্যবর্ধনের যে কাজ চলছে সেটা নিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে পাউবো। এখানেও নদীর প্লাবনভূমি রক্ষার যে প্রশ্ন সেটাও মানা হচ্ছে না। শুরু থেকে এ প্রকল্পে স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্য দিয়ে ভৈরব নদ খনন এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলছে।’

পাউবো যশোর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, যশোর শহরে ভৈরব নদের দুই প্রান্তে দড়াটানা ব্রিজ থেকে বাবলাতলা ব্রিজ পর্যন্ত এক কিলোমিটার এবং শহরের অন্য প্রান্ত নীলগঞ্জ ব্রিজ থেকে শ্মশান পর্যন্ত ৩০০ মিটার হাঁটার রাস্তা নির্মাণ ও দড়াটানা ব্রিজ থেকে গরীব শাহ (র.) মাজার পর্যন্ত ২০০ মিটার পাড়ের সৌন্দর্যবর্ধন কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০২০ সালে। ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় তিনটি প্যাকেজের মোট দেড় কিলোমিটার প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়ছিল সাড়ে ১৩ কোটি টাকা। যৌথভাবে প্রকল্পটির কাজ পায় মেসার্স নূর হোসেন অ্যান্ড মেসার্স শামীম চাকলাদার। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে শহরবাসী বিনোদনের জন্য নির্মল পরিবেশ পাবে নদের পাড়ে। দুই পাড়ে এক কিলোমিটার হাঁটার রাস্তা, মিনি পার্কের পানির ফোয়ারা, ওয়াশরুম, বসার ব্যবস্থা ও ফুল বাগান থাকার কথা। কিন্তু প্রকল্পটির মেয়াদ দুই দফা বাড়িয়ে চলতি বছরের জুনে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে ৮০ শতাংশ। তবে প্রকল্পের শিডিউল অনুযায়ী এখনো স্থাপনা দৃশ্যমান হয়নি। সর্বশেষ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে প্রকল্পের মূল ব্যয়ের সঙ্গে অউন্নয়ন রাজস্ব খাত থেকে আরো ১ কোটি টাকার বরাদ্দের প্রস্তাব পাঠিয়েছে পাউবো। অভিযোগ রয়েছে জুনে এ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীরগতির কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি। তবে পাউবো বলছে, আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ কাজ শেষ হবে। এরপর যশোরবাসীর জন্য উন্মুক্ত হবে প্রকল্পটি।

প্রকল্পটির স্থান শহরের দড়াটানা, বাবলাতলা ব্রিজ থেকে তেঁতুলতলা পর্যন্ত এবং নীলগঞ্জ ব্রিজ থেকে শ্মশান পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলমান। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নীলগঞ্জ ব্রিজ থেকে শ্মশান পর্যন্ত কাজ শেষ পর্যায়ে। বাবলাতলা ব্রিজ থেকে তেঁতুলতলা পর্যন্ত হাঁটার রাস্তার ঢালাইয়ের কাজ শেষ। বাবলাতলার দিক থেকে টাইলস লাগানোর কাজ শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে এ প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে ১৫ শতাংশ ভাষ্য নির্মাণকাজসংশ্লিষ্টদের। তিনটি পানির ফোয়ারার মধ্যে দুটি ফোয়ারার কাজ শেষ। এখনো টাইলস বসানো, বাথরুম, বসার ব্যবস্থা হয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী গোলাম রসুল বলেন, ‘নকশা সংশোধন, শ্রমিক সংকট, নদ খননকাজ শেষ হতে দেরি হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ সম্ভব হয়নি। তবে দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। শিগগির কাজ সম্পন্ন করে পাউবোর কাছে হস্তান্তর সম্ভব হবে।’

পাউবো যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘নানা কারণে প্রকল্পের মেয়াদের মধ্যে কাজ শেষ করা যায়নি। বলা যায়, প্রকল্পের ৮০ ভাগ কাজ শেষ পর্যায়ে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ এ প্রকল্প যশোরবাসীর জন্য উন্মুক্ত করা হবে। বাকি ২০ শতাংশ কাজ শেষ করার জন্য প্রকল্পের মূল ব্যয়ের সঙ্গে অউন্নয়ন রাজস্ব খাত (এনবিআর) থেকে আরো ১ কোটি টাকার চাহিদা চেয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০১৬ সালে ২৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯২ কিলোমিটার ভৈরব নদ খনন প্রকল্প গ্রহণ করে পাউবো। পাঁচ বছর মেয়াদি ‘ভৈরব রিভার বেসিন এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন’ প্রকল্প শেষ হয়েছে। এ প্রকল্প শেষ হলেও প্রবহমান হয়নি নদটি। বরং নদকে খননের নামে খালে রূপান্তরিত করা হয়েছে বলে দাবি সচেতন মহলের।