পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান জেনারেল নিয়াজি ১৪ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছ থেকে এক জরুরি বার্তা পান। বার্তায় তাকে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়। যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দেয়া হলেও ওই বার্তায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ নিয়ে কোনো বক্তব্য ছিল না। বরং ইয়াহিয়া খানের প্রতিশ্রুতি ছিল, মিত্রবাহিনীর অভিযান থামাতে জাতিসংঘের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেবেন তিনি। অন্যদিকে রেডিও ও যুদ্ধবিমান থেকে বিলি করা প্রচারপত্রের মাধ্যমে পাকিস্তানিদের প্রতি ক্রমাগত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে গিয়েছে মিত্রবাহিনী। একই দিনে পাকিস্তানের জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স থেকে বার্তা আসে, উত্তর থেকে চীন ও দক্ষিণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসছে।  পরস্পরবিরোধী দুটি বার্তায় ঢাকার পাকিস্তানি সামরিক কর্তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। পরদিন ১৫ ডিসেম্বর এ বিভ্রান্তির মধ্য দিয়েই দিন শুরু হয় তাদের। এ দিনটিতেও জেনারেল নিয়াজিকে স্পষ্ট কোনো বার্তা দিতে পারেননি ইয়াহিয়া খান। অস্পষ্ট কিছু বার্তার মাধ্যমে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার গুরুভারটি নিয়াজির ওপরই দিয়ে রেখেছিলেন তারা। 

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় ১৫ ডিসেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ এখন পর্যন্ত খুব একটা বেশি মনোযোগ পায়নি। যদিও দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণী দিন হিসেবে ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বরের তাত্পর্য কোনো অংশে কম নয় বলে মনে করছেন ঐতিহাসিকরা। পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের বিষয়টি নিশ্চিতও হয়েছিল এ দিনটিতেই। 

বিভ্রান্ত নিয়াজি বুঝে উঠতে পারছিলেন না তার কী করা উচিত। যদিও তার কাছে তখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত লোকবল ছিল। পরবর্তী সময়ে জুলফিকার আলি ভুট্টো গঠিত হামুদুর রহমান কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নিয়াজির নিজের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা রক্ষার জন্য তখনো তার হাতে প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার সৈন্য ছিল। সে সময় চাইলে তিনি তখনো আরো দুই সপ্তাহের মতো সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারতেন।

কিন্তু ততদিনে নিয়াজি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার যাবতীয় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। যশোর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অনেকটাই আস্থাশীল ছিলেন তিনি। কিন্তু মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যেই গ্যারিসন দুটির পতন তাকে নৈতিকভাবে অনেক দুর্বল করে ফেলেছিল। এ অবস্থায় ১৫ ডিসেম্বর পুরোটা দিন ইয়াহিয়া খান ও নিজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পরিষ্কার ও স্পষ্ট কোনো বার্তার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।

কিন্তু বিভ্রান্তির মধ্যে ছিলেন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানও। তিনি নিজেও বুঝতে পারছিলেন না কী করা উচিত। জাতিসংঘের বৈঠকগুলো থেকেও প্রত্যাশামাফিক ফলাফল পাচ্ছিলেন না তিনি। পূর্ব-পশ্চিম কোনো রণাঙ্গন থেকেই কোনো সুখবর পাচ্ছিলেন না তিনি। ওয়াশিংটন থেকেও আশা করার মতো কোনো বার্তা পাচ্ছিলেন না তিনি।

এমন অবস্থায় জেনারেল নিয়াজিকে একটি বার্তা পাঠান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল এএইচ খান। তাতে বলা হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা আপনার আছে। কিন্তু আমার উপদেশ হলো ভারতীয়দের তরফ থেকে যে শর্তই দেয়া হোক না কেন, আপনি তা গ্রহণ করুন।

স্পষ্ট নির্দেশনা না হওয়ায় নিয়াজি চাইলেই এ উপদেশ উপেক্ষা করতে পারতেন। ঢাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দুই স্তরের সুরক্ষাব্যূহ তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, অন্যান্য স্থান থেকে পিছু হটা পাকিস্তানি সৈন্যদের সুরক্ষাব্যূহ দুটিতে  নিয়োজিত করার কথা ছিল নিয়াজির। কিন্তু তার এ পরিকল্পনা সফল হয়নি। দেশের অন্যান্য স্থান থেকে পিছু হটা পাকিস্তানি সৈনিকরা ঢাকার প্রতিরক্ষার জন্য আসতেই পারেনি।

অন্যদিকে ঢাকার পাকিস্তানি বেসামরিক প্রশাসনও ছিল বিশৃঙ্খল অবস্থায়। আগের দিন ঢাকার গভর্নর হাউজে জরুরি এক বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু মিত্রবাহিনীর রেডিও ইন্টারসেপশনের মাধ্যমে এ খবর জানতে পেরে যায়। গভর্নর হাউজের হামলা চালায় ভারতীয় বিমানবাহিনী। পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নর আবদুল মোতালেব মালিক দ্রুত নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেন। সেখানে বসেই নিজের পদত্যাগপত্র লেখেন ভীতসন্ত্রস্ত আবদুল মোতালেব মালিক। শিগগিরই তিনি, তার গোটা মন্ত্রিসভা ও পাকিস্তানপন্থী শীর্ষ আমলারা রেডক্রসের নিরপেক্ষ এলাকা হিসেবে ঘোষিত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আশ্রয় নেন। গভর্নরের পদত্যাগ এবং মন্ত্রিসভা ও শীর্ষ আমলাদের পলায়নে ১৫ ডিসেম্বরেই ঢাকার বেসামরিক প্রশাসন পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর প্রধান স্যাম মানেকশও চাইছিলেন যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক। এজন্য আগের দিনের মতো ওই দিনও পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতি আত্মসমর্পণের আহ্বান প্রচার করে যেতে থাকেন তিনি। বাংলা, পশতু ও উর্দু ভাষায় লিফলেটও বিতরণ হতে থাকে। যদিও পাকিস্তানিদের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে শক্ত ও দৃঢ় শব্দের প্রয়োগ করে যান তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টার মধ্যে মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করলেই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হবে, অন্যথায় নয়।

এছাড়া পাকিস্তানি হাইকমান্ডকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার হেডকোয়ার্টারের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিও সরবরাহ করা হয়, যাতে তারা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত জানিয়ে যোগাযোগ করতে পারে। এছাড়া সদিচ্ছার নিদর্শন হিসেবে সেদিনই অর্থাৎ ১৫ ডিসেম্বর বিকাল ৫টা থেকে ঢাকার ওপর মিত্রবাহিনীর সব ধরনের হামলা বন্ধের ঘোষণাও দেন তিনি। পরে নিয়াজির অনুরোধে আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়সীমা বাড়িয়ে ১৬ ডিসেম্বর বেলা ৩টা নির্ধারণ করা হয়।